প্রতিষ্ঠার পর প্রথমবারের মতো নিজস্ব ভবন পেতে যাচ্ছে স্বাধীনতা-সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। বঙ্গবন্ধু এভিনিউর দৃষ্টিনন্দন ও আধুনিক সব সুযোগসুবিধা সম্পন্ন নতুন ১০ তলা ভবন হবে দলটির স্থায়ী ঠিকানা। আগামীকাল শনিবার ৬৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নতুন ভবনের উদ্বোধন করবেন।

উপমহাদেশের প্রাচীন দল আওয়ামী লীগ ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন যাত্রা করেছিল পুরান ঢাকার রোজগার্ডেনে হওয়া সম্মেলনের মধ্য দিয়ে। সময়ের বিবর্তনে ও প্রয়োজনের তাগিদে দলটিকে কার্যালয় পরিবর্তন করতে হয়েছে বেশ কয়েকবার। ১৫০ মোগলটুলী আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনের আঁতুরঘর হলেও কারকুনবাড়ী লেনের একটি ভাড়া বাড়িতে প্রথম দলীয় কার্যক্রম শুরু হয় আজকের আওয়ামী লীগের।

এরপর ১৯৫৬ সালে পুরান ঢাকায় ৫৬ সিমসন রোড, ১৯৬৪ সালে ৯১ নবাবপুর রোডে, এরপর সদরঘাটের রূপমহল সিনেমা হলের গলি, পুরানা পল্টনে কার্যালয় স্থানান্তরিত হয়ে দলটির সাংগঠনিক কার্যক্রম চলে অনেকদিন। এরপর যায় সার্কিট হাউস রোডে।

১৯৮১ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের হাল ধরলে নানা বিবেচনায় ঠিকানা হয় ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউ। সেটাও আজ থেকে প্রায় ৩৭ বছর আগে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, গণমুখী রাজনীতি, সংসদীয় নির্বাচন, দলটির মতায় যাওয়া, সারাদেশে নেতাকর্মীদের সুসংগঠিত করাসহ সবই পরিচালিত হয়েছে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের এ কার্যালয় থেকে।

শেখ হাসিনা তিনবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন এই বঙ্গবন্ধু এভিনিউ থেকে রাজনৈতিক আন্দোলন পরিচালনা করেই। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে দলটির পরিসর বেড়েছে অনেক। সারাদেশে অসংখ্য নেতাকর্মী ও সমর্থকের পাশাপাশি অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের কার্যক্রম এ ছোট্ট কার্যালয় থেকে পরিচালনা কঠিন হয়ে উঠেছিল শেষ কিছুদিন। সেই চিন্তা থেকেই ২০১১ সালে নতুন কার্যালয়ের পরিকল্পনা মাথায় আসে আওয়ামী লীগ নেতাদের।

উদ্বোধনের অপেক্ষায় আওয়ামী লীগের নতুন কার্যালয়
সরকারি বিধি অনুযায়ী নানা কার্যক্রমের পর ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে ভবন নির্মাণের আনুষ্ঠানিক কাজে হাত দেওয়া হয়। লক্ষ্য ছিল দুই বছরের মধ্যে কাজ শেষ করার। দ্রুত শেষ করতে কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়নি, দলের সভাপমিণ্ডলীর সদস্য পূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ সরাসরি এ কাজের তত্ত্বাবধান করেন। তাই নির্ধারিত সময়ের চার মাস আগেই ভবন নির্মাণ সম্পন্ন। রাজউকের ইমারত নির্মাণ বিধিমাল মেনে সামনের দিকে রাস্তা থেকে ১০ ফুট ও পেছনের দিকে ১৭ ফুট জায়গা ছেড়ে মোট জমির ৬৫ শতাংশের উপর এটি নির্মাণ করা হয়েছে।

দলের কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা ও ভবন নির্মাণ-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগের নিজস্ব ফান্ড থেকে ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ভবনটি নির্মাণ করা হয় (ফার্নিচার ও ডেকোরেশনসহ)। এর সামনের দেয়ালের দুইপাশ কাচ দিয়ে ঘেরা আর মাঝখানে সিরামিকের ইটের বন্ধন। সামনের দেয়ালজুড়ে দলের সাইনবোর্ডসহ দলীয় স্লোগান ‘জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু’, দলের চার মূলনীতি খোদাই করে লেখা। আর সামনে-পেছনে ছেড়ে দেওয়া জায়গায় হবে বাগান।

এছাড়াও ভবনের সামনে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় নিহতদের স্মরণে স্থায়ী স্মৃতিসৌধ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। ভবনটির প্রথম থেকে তৃতীয়তলা পর্যন্ত প্রতিটি ফোর ৪ হাজার ১০০ বর্গফুট। চতুর্থতলা থেকে উপরের সব কটি ৩ হাজার ১০০ বর্গফুটের।

নেতারা মনে করছেন, নতুন দৃষ্টিনন্দন ও অত্যাধুনিক ভবনে আগামী জাতীয় নির্বাচনের কাজ পরিচালনা করতে গিয়ে উৎসাহ পাবেন দলটির নেতাকর্মীরা।

ভবন নির্মাণের দায়িত্বে থাকা গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘নির্বাচনের আগে দলের নেতাকর্মীদের জন্য নতুন কার্যালয় একটি উপহার। নতুন করেই শুরু হবে পথচলা। আশা করছি এ ভবন আমাদের জন্য নতুন বিজয় বয়ে আনবে।’

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনে আওয়ামী লীগের নতুন ভবন উদ্বোধন দলের নেতাকর্মীদের বাড়তি অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে।’

নেতারা জানান, নতুন ভবন উদ্বোধনের পর আওয়ামী লীগের সব সাংগঠনিক কার্যক্রম চলবে এখান থেকেই। আর ধানমণ্ডির আওয়ামী লীগ সভাপতির কার্যালয় থেকে দলের নির্বাচনী কার্যক্রম ও সিআরআইসহ দলের অন্যান্য সংস্থার গবেষণামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হবে।

গত বুধবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, ভবনজুড়ে পুলিশসহ নিরাপত্তারীদের কড়াকড়ি। ঢুকতেই হাতের বাম পাশে অভ্যর্থনা ডেস্ক। বিশাল ফোর। সিঁড়ির পাশাপাশি দুটি লিফট। তবে বেসমেন্ট ও প্রথমতলায় গাড়ি পার্কিংয়ের কথা বলা হলেও পরে এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে আওয়ামী লীগ। সামনের সড়কে ছেড়ে দেওয়া নিজস্ব জায়গায় পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করা হবে।

নিচে রক্ষিত নির্দেশনানুযায়ী জানা যায়, চতুর্থ ও পঞ্চমতলায় সাধারণ অফিস, ডিজিটাল লাইব্রেরি, মিডিয়া রুম। ষষ্ঠতলায় সম্মেলন কক্ষ। সপ্তমতলা দলের কোষাধ্যরে জন্য। অষ্টমতলায় সাধারণ সম্পাদকের অফিস। আর নবমতলায় বসবেন দলের সভাপতি। একদম উপরে দশমতলায় থাকবে ক্যাফেটেরিয়া।

কর্তব্যরতদের সঙ্গে কথা বলে অবশ্য জানা যায়, নির্দেশনার কিছু ব্যত্যয় ঘটতে পারে। আগের নির্দেশনানুযায়ী বেসমেন্ট ও নিচতলায় কার পার্কিং এবং ছাদে হ্যালিপ্যাড স্থাপন আপাতত হচ্ছে না। দ্বিতীয়তলার কনফারেন্স রুমে ৩৫০ জনের বসার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তৃতীয়তলায় ২৪০ জনের বসার ব্যবস্থা থাকবে। মাঝখানে কনফারেন্স রুম আর দুই পাশে বেশকিছু কক্ষ রয়েছে।

তিনতলার সামনের অংশটা ‘ওপেন স্কাই টেরেস’। অনেকটা বাসার ড্রয়িংরুম বা পাঁচতারকা হোটেলের আদলে করা হবে এ অংশ। এখানে কৃত্রিম বাগানের ফাঁকে ফাঁকে চেয়ার-টেবিল দিয়ে বসার ব্যবস্থা থাকছে। পাশাপাশি থাকবে চা-কফি খাওয়ার আয়োজন।

এ ছাড়া ভবনের চার ও পাঁচতলায় দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ছাড়াও সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিমসহ সমমনা অন্যান্য সংগঠনের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হবে। সাত, আট ও নয়তলায় দলীয় সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদক, বিষয়ভিত্তিক সম্পাদকসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের কক্ষ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে সভাপতির ফোর থাকবে বুলেটপ্রুফ ডাবল গ্লাস। ভবনের বিভিন্ন তলায় রাখা হয়েছে ডিজিটাল লাইব্রেরি, সেমিনার রুম এবং সাংবাদিক লাউঞ্জ।

দলীয় সূত্র জানায়, শনিবার গণপূর্তমন্ত্রী ওইদিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে নতুন কার্যালয়ের চাবি তুলে দেবেন। উদ্বোধন শেষে প্রধানমন্ত্রী নিজেই সভাপতিমণ্ডলী, যুগ্ম সম্পাদকসহ অন্য নেতা ও সহযোগী সংগঠনগুলোর জায়গা নির্ধারণ করে দেবেন। এর মধ্যে দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের জন্য রাখা হয়েছে সুপরিসর কক্ষ।

সভাপতির কক্ষের সঙ্গে রয়েছে বিশ্রামাঘার ও নামাজের জায়গা। ডিজিটাল লাইব্রেরি, ভিআইপি লাউঞ্জ, সাংবাদিক লাউঞ্জ, ডরমিটরি ও ক্যান্টিনও থাকছে। আর ভবনটির ছয় বা সাততলা পর্যন্ত ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, কৃষকলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, মহিলালীগসহ বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের অফিস থাকবে।

আওয়ামী লীগ নেতারা মনে করেন, টানা দুই মেয়াদ মতায় থেকে বিপুল উন্নয়ন সাধন করায় আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা অনেকটাই বেড়েছে। পাশাপাশি গত দুই তিন বছরে সংগঠনও অনেকটা শক্তিশালী। সারাদেশে বেড়েছে কর্মী-সমর্থক। এসব কথা মাথা রেখেই আওয়ামী লীগের নতুন কার্যালয়টি নির্মিত হয়েছে বৃহৎ পরিসরে।

বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে নতুন কার্যালয়টি যেখানে নির্মিত হয়েছে, সেই জমিটি ইতোমধ্যে ৯৯ বছরের জন্য লিজ নেওয়া হয়েছে সরকারের কাছ থেকে। লিজ ও কেনা সবমিলিয়ে ৭ কাঠা জমির ওপর মাটির নিচে (গ্রাউন্ড ফোর) একতলাসহ দশতলা মূল ভবন। আধুনিক প্রযুক্তিতে নির্মিত ভবনটি পুরোটাই থাকবে ওয়াইফাইয়ের আওতায়।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here