বকুল আহমেদ

চলমান বিশেষ অভিযানের মধ্যেও মাদক কেনাবেচা বন্ধ হয়নি। কারবারিরা নিত্যনতুন কৌশল নিচ্ছে। ইয়াবা বহনে তারা মানুষের ‘পাকস্থলী ভাড়া’ করে। টেকনাফ থেকে ঢাকায় একটি চালান পাচার করে দিলে ‘পাকস্থলী ভাড়া’ হিসেবে একজনকে দেওয়া হয় ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা। আর মৃত্যুকে তোয়াক্কা না করেই পাকস্থলীতে করে ইয়াবা পাচার করে দিচ্ছে অনেকে।

শুধু ইয়াবা নয়, স্বর্ণের বারও পাচার করা হয়। চিকিৎসকরা বলছেন, পাকস্থলীতে ইয়াবা ও স্বর্ণবার বহন খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। যেকোনো সময় বহনকারীর মৃত্যু হতে পারে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের চিফ কনসালট্যান্ট ডা. সৈয়দ ইমামুল হোসেন সমকালকে বলেন, পাকস্থলীতে ইয়াবা বহন করলে যেকোনো সময় নাড়ি ছিদ্র কিংবা পেঁচিয়ে যেতে পারে। পাকস্থলীতে ইয়াবা প্রবেশ করানোর পর তারা পায়ুপথ দিয়ে বের করে। যদি বের না হয়, তাহলে জরুরি অস্ত্রোপচার করা ছাড়া উপায় থাকবে না। এ ছাড়া বহনকারী যে পলিথিনে ভরে ইয়াবা গিলে ফেলে, সেই পলিথিন যদি পেটের ভেতরে ছিঁড়ে যায়, তাহলে ইয়াবার বিষ শরীরে দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে। এতে হঠাৎ মৃত্যু হতে পারে তার।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, মোটা পলিথিনে ৫০টি ইয়াবা ভরে একটি প্যাকেট করা হয়। এরপর ওই প্যাকেট স্কচটেপ দিয়ে মোড়ানো হয়। একেকজন সর্বনিম্ন ৩০ থেকে সর্বোচ্চ ৫০টি প্যাকেট কলার মধ্যে নিয়ে গিলে ফেলে। পায়ুপথ দিয়ে সেগুলো বের না করা পর্যন্ত কোনো খাবার খায় না তারা। টেকনাফ থেকে এভাবে পেটে করে ইয়াবা ঢাকায় এনে পায়ুপথ দিয়ে বের করে পৌঁছে দেয় পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে। পাকস্থলীতে ইয়াবা ও স্বর্ণবার বহনের সময় সম্প্রতি বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং শুল্ক্ক ও গোয়েন্দা সংস্থা।

১০ জুন রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থেকে জসিম উদ্দিন, নুরুল আফসার ও জহির উদ্দিন নামে তিন তরুণকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তাদের মধ্যে জসিম উদ্দিন ও নুরুল আফসার টেকনাফ থেকে পাকস্থলীতে করে ইয়াবা নিয়ে আসে ঢাকায়। ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছে, তারা ইয়াবা ব্যবসায়ী নয়। বহনকারী। এক চালান ইয়াবা টেকনাফ থেকে ঢাকায় পৌঁছে দিলে গাড়ি খরচ বাদে তারা ১৫ হাজার টাকা করে হাজিরা পায়। এক চালানে একজন সর্বনিম্ন এক হাজার থেকে সর্বোচ্চ দুই হাজার পিস ইয়াবা পেটে করে আনতে পারে। ইয়াবার প্যাকেট পানি দিয়ে গিলতে গেলে অনেক ক্ষেত্রে বমি হয়ে যায়। এ জন্য সাগর কলার মধ্যে প্যাকেট ঢুকিয়ে তা গিলে ফেলে।

নুরুল আফসার ও জহির উদ্দিন

কক্সবাজারের ডিলার বদিউল আলমের ইয়াবা বহনে কাজ করে তারা। জসিম ও নুরুল আফসারের বাড়ি টেকনাফে। জসিমের গ্রামের নাম নয়াপাড়া এবং নুরুল আফসারের গ্রাম মাথাভাঙ্গা।

২৭ মে রাজধানীর দক্ষিণখানের পূর্ব গাওয়াইর এলাকা থেকে ছয়জনকে গ্রেফতার করে ডিবি। তাদের কাছ থেকে তিন হাজার ৩৫০ পিস ইয়াবা জব্দ করা হয়। গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিরা হলো সেলিম মোল্লা, আফছার ওরফে বাবুল, মামুন শেখ, শরিফুল, ফাহিম সরকার ও রাজিব হোসেন। তাদের মধ্যে সেলিম ও বাবুল পেটে করে ইয়াবা ঢাকায় আনত। রেজওয়ান নামে এক ইয়াবা কারবারি তাদের ব্যবহার করত।

ডিবির অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মুহাম্মদ হাবীবুন নবী আনিসুর রশিদ বলেন, জসিম ও নুরুল টেকনাফ থেকে পেটে করে ইয়াবা এনে ঢাকায় সরবরাহ করে। কার কাছ থেকে নিয়ে আসে এবং ঢাকায় কাদের কাছে সেগুলো পৌঁছে দেয়, সেসব তথ্য তারা দিয়েছে। সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জামাল উদ্দীন আহমেদ বলেন, মানবদেহ ও গাড়ির বিভিন্ন স্থানে বহন করা মাদক শনাক্ত করতে একধরণের যন্ত্র কেনা হচ্ছে। যা দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে তল্লাশি করে লুকায়িত স্থানের মাদক উদ্ধার করা সম্ভব হবে।

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) সহেলী ফেরদৌস বলেন, ইয়াবা যাতে দেশে ছড়িয়ে না পড়ে, সে ব্যাপারে কঠোর নজরদারি রয়েছে। সন্দেহভাজনদের চেকপোস্টে তল্লাশি করা হয়। তবে পাকস্থলীর মধ্যে ইয়াবা বহন করলে তা ধরা একটু কঠিন। এর পরও সন্দেহভাজনদের এক্স-রে করা হয়। স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে যারা পাকস্থলীতে ইয়াবা বহন করছে, তাদের সচেতন হতে হবে। ইয়াবা বহন করে যে টাকা তারা পাবে, তার চেয়ে ক্ষতি বেশি- এটা তাদের ভাবা দরকার। খবর সমকালের।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here