নিঃসন্দেহে তারা একেক জন বিশ্বতারকা। বিশ্বফুটবলের অমর জ্যোতি। ফুটবল আকাশে জ্বলেছেন আপন মহিমায়। ক্যারিয়ারের কোন কালেই তাদের ভাটা পড়েনি। যদিওবা কালক্রমে হেরেছেন, জেগেছেন দ্বিগুণ শক্তিতে। চলেছেন দুর্বার গতিতে, হয়েছেন ফুটবলের মহামানব।

কিন্তু আন্তর্জাতিক ফুটবল ক্যারিয়ারে তাদের চলার পথটা স্তব্ধ করে দিয়েছে একটি ব্যর্থতা। তা হলো, কখনোই বিশ্বকাপ জেতা হয়নি তাদের। চীনের দুঃখ যেমন হোয়াং হো নদী, ঠিক তেমনই এই মহামানবদের দুঃখ বিশ্বকাপ। অন্তত একটিবারের জন্যও বিশ্বকাপে চুমু দেয় হয়নি এসব তারকাদের।

ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের পুরস্কার বিশ্বকাপ জেতা হয়নি পাঠকদের জন্য রয়েছে এমন পাঁচ বিশ্বতারকার গল্প।

লিওনেল মেসি
সেই ১৯৮৬ থেকে ২০১৮। হিসাব বলছে, ৩২ বছর পার হলেও কোন আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে জেতা হয়নি আর্জেন্টিনার। ১৯৭৮ ও ১৯৮৬ সালে আর্জেন্টিনা যে দুটি বিশ্বকাপ জিতেছে তার একটি ম্যারাডোনার হাত ধরে। এরপর আর একজন ম্যারাডোনার সন্ধান পায়নি সাদা-আকাশি জার্সির দেশটি। যদিও সর্বশেষ ব্রাজিল বিশ্বকাপের চূড়ায় এসে জার্মানের কাছে হেরে যায় আর্জেন্টিনা। আর সে কারণে ১১ বছরের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে একবারের জন্যও শিরোপায় চুমু দেয়া হয়নি মেসির।

দুঃখের ব্যাপার হলো, মেসির দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনবার কোপা আমেরিকা কাপ হেরেছে আর্জেন্টিনা। কিন্তু ক্লাব ক্যারিয়ারে একশোতে একশো মেসি। পাঁচবারের মতো জিতেছেন বিশ্বসেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার ব্যালন ডি’অর। এছাড়া অগণিত পুরস্কার রয়েছে ঝুলিতে। কিন্তু একটা বিশ্বকাপ না পাওয়ার কষ্ট সবই ম্লান করে দিয়েছে।

এদিকে রাশিয়া বিশ্বকাপে এসেও নরকের দ্বারপ্রান্তে মেসির আর্জেন্টিনা। গ্রুপ পর্বে ইতোমধ্যে তিন ম্যাচের দুটিতে খেলেছে তার দল। যাতে একটি জয় এবং অন্যটিতে হার। আর হারটাও ছিল খুবই লজ্জাজনক। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে তিন তিনটি গোল হজম করে বিদায় ঘণ্টা শোনার অপেক্ষায় সাদা-আকাশি জার্সির দল। যদিও কিছুটা মারপ্যাঁচে অন্ধকার সুড়ঙ্গ থেকে আলোকবর্তিকা দেখছে তারা। জটিল ধাঁধা ও কঠিন সমীকরণ উতরে দ্বিতীয় রাউন্ডের টিকিট পেতে হবে তাদের। তবে তার জন্য গ্রুপ পর্বের সর্বশেষ ম্যাচে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে জয় এবং ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে আইসল্যান্ডের হারের জন্য প্রার্থনা করতে হবে আলবিসেলেস্তাদের।

প্রসঙ্গত, আন্তর্জাতিক ফুটবলে ৬১টি গোল করেছেন মেসি। এছাড়া তার এসিস্টে গোল হয়েছে ১৭টি।

ইউসেবিও
কথায় আছে, ভালো মানুষদের জন্য ভুল জায়গায়। চলতি বিশ্বকাপে পর্তুগালের খেলা দেখে হয়তো অনেকেই এমনটাই বলেছেন। বলাটাই স্বাভাবিক। কারণ গ্রুপ পর্বে দেশের হয়ে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো যেখাবে খেলছেন তা যে কারো চক্ষু চড়ক গাছ করে দিতে পারেন। এক কথায় অনন্য অসাধারণ খেলছেন সিআরসেভেন। গ্রুপ পর্বে নিজেদের দুই ম্যাচে পেয়েছেন গোলের দেখা।

কিন্তু কথা হলো, একার চেষ্টায় এই রোনালদো কতদূর নিয়ে যাবেন দলকে? প্রশ্নটা যৌক্তিক। কারণ ১৯৬৬ সালে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে অংশ নেয়া পর্তুগিজ তারকা ইউসেবিওকে নিয়েও কথা উঠেছিল। রোনারদোর মতো তিনিও দলকে টেনেটুনে সেমিতে নিয়ে বাদ পড়েন।

মোনালিসার সেই চিত্রশিল্পী লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির মতো ইউসেবি-রোনালদোদের অমরগাঁথা কাব্য যেথায়-সেথায় লিখা হলেও বারবারই বিশ্বকাপ স্বপ্ন অঁধরাই থেকেছে পর্তুগিজদের। এবার কি সেরকমেই হবে? এবারও কি ব্ল্যাক পেন্থার খ্যাত ইউসেবির কণ্ঠে রোনালদো বলবেন, ‘আমি বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়। দুনিয়ার সেরা গোলদাতা। আমি সব করেছি, পারিনি শুধু বিশ্বকাপটা জিততে।’

প্রসঙ্গত, ক্যারিয়ারে ৭৪৫ ম্যাচে অবিশ্বাস্য ৭৩৩ গোল করেছেন ইউসেবিও। দেশের পক্ষে ৬৪ ম্যাচে লক্ষ্যভেদ করেছিলেন ৪১বার।

জিকো
বিশ্বকাপ ও ব্রাজিল ফুটবল দলকে নিয়ে বাংলাদেশিদের উন্মাদনা দেখতে সদূর ব্রাজিলে থেকে ছুটে আসেন দেশটির বিখ্যাত স্পোর্টস চ্যানেলের তিন সাংবাদিক। বাংলাদেশে তাদের আগমন এবং বাংলাদেশিদের ব্রাজিল প্রীতিতে মুগ্ধ হয়ে রাজধানীর হোটেল ওয়েস্টিনে একটি সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করে ব্রাজিল এম্বাসি। আর এসময় দেশটির রাষ্ট্রদূত হোয়াও তাবারেজ ডি অলিভিয়েরা জুনিয়রের মুখ থেকে স্পষ্টভাবে শুনতে পাই ‘বিশ্বকাপ পরবর্তীতে বাংলাদেশে আসছেন জিকো। ব্রাজিলের সাদা পেলে হিসেবে যার সুনাম সারাবিশ্বে।

১৯৮২ ও ১৯৮৬ বিশ্বকাপের ধ্রুপদি ব্রাজিল দলের এই প্রাণভোমরার একটাই দুঃখ। তা হলো ব্রাজিলকে একবারও বিশ্বকাপ এনে দিতে পারেননি।

৫ ফুট সাড়ে সাত ইঞ্চি উচ্চতার এই এট্যাকিং মিডফিল্ডার তিনবার দক্ষিণ আমেরিকার ‘প্লেয়ার অফ দ্য ইয়ার’, এমনকি একবার ‘ওয়ার্ল্ড প্লেয়ার অফ দ্য ইয়ার’ নির্বাচিত হয়।

প্রসঙ্গত, দলের হয়ে ৮৮বার মাঠে নেমে ৬৬টি গোল করেছেন জিকো৷

ফেরেঙ্ক পুসকাস
বর্তমান বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীদের অতি পছন্দের দলের তালিকায় ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা কিংবা জার্মান-ফ্রান্স। কিন্তু ফুটবল বিশ্বকাপের গোড়ার দিকে ব্যাপক আধিপত্য ছিল হাঙ্গেরির। আর সেই দলটির অন্যতম খেলোয়াড় ছিলেন ফেরেঙ্ক পুসকাস। ১৬ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে মেক্সিকোর আন্তোনিও কারভাহাল খেলেছেন পাঁচটি বিশ্বকাপ। অথচ ১৭ বছর ব্যাপ্ত ফুটবলার জীবনে পুসকাস অংশগ্রহণ করেন মাত্র দুটি বিশ্বকাপে। তাও আবার দুটি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করেন ভিন্ন দুই দলের হয়ে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলে ১৯৪৬ সালে অনুষ্ঠিত হয়নি বিশ্বকাপ। এরপর ১৯৫০ বিশ্বকাপ থেকে নিজেদের নাম প্রত্যাহার করে নেয় পুসকাসের মাতৃভূমি হাঙ্গেরি। এর কারণে ১৯৫৪ সালে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করতে হয় তাকে।

মজার ব্যাপার হলো, পঞ্চাশের দশকে হাঙ্গেরির ফুটবল টিমকে বিবেচনা করা হতো অন্যতম সেরা দল হিসেবে৷ ফেরেঙ্ক পুসকাস তখন সে দলের মধ্যমণি৷ টানা চারবছর দলটি কিনা কোন ম্যাচ হারেনি৷ অথচ ১৯৫৪ বিশ্বকাপে ফাইনালে তৎকালীন পশ্চিম জার্মানির কাছে হেরে যায় হাঙ্গেরীয়রা, ফলে পুশকাসের কাছে বিশ্বকাপ অধরাই থেকে যায়৷

রাউল
অভাগা-র্দুভাগা, নেতিবাচক সব বিশেষণ যোগ করা যায় স্প্যানিশ অধিনায়ক রাউলের নামের আগে। কারণ ২০০৬ সালে রাউল আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নেওয়ার পর থেকেই তার দল শিরোপা জিতে।

প্রসঙ্গত, নিজের দেশের হয়ে ১০২ বার মাঠে নেমে ৪৪টি গোল করেছেন রাউল৷

আরিফুর রাজু
ক্রীড়া সাংবাদিক

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here