শনিবার রাত ৯টা ৫০, স্তব্ধ পুরো দেশ। অথচ মিনিট দুয়েক আগেও প্রতিটি ঘরে চলছিল বাঁধভাঙা চিৎকার-চেঁচামেচি। কেউ পক্ষে কেউ বা বিপক্ষে। এবারও পারলেন না লিওনেল মেসি। দ্বিতীয় পর্বেই আর্জেন্টিনাকে উড়িয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিল ফ্রান্স। ১৯৮৬ সালের পর থেকে তেমন কোনো সাফল্য না পেলেও বাংলাদেশিদের কাছে জনপ্রিয়তায় অন্যতম শীর্ষে থাকা আর্জেন্টিনার এই নাজুক হারে হতাশ সমর্থকরা। অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। ছাদে, বারান্দার ফাঁকে কিংবা গাছে টানানো পতাকাটা নামিয়ে ফেলেছেন। গায়ের প্রিয় জার্সিটাও খুলে স্বযতেœ রেখে দেন কাতার বিশ্বকাপের জন্য। তবে মেসি লেখা আকাশী-সাদা এই পোশাকটা আর পরতে পারবেন কি না, সেটাও ভাববার আছে! প্রিয় তারকার বয়স যে হবে তখন ৩৫।

বিশ্বকাপ এলেই আর্জেন্টিনা কিংবা ব্রাজিলে বিভক্ত হয়ে যায় আবেগী বাঙালি। উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে শহর-বন্দর গ্রাম-গঞ্জে। ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ে ফুটবল উন্মাদনা, চলে টক-মিষ্টি তর্ক-বিতর্ক। এতেই যেন বিনোদন খুঁজেন সমর্থকরা। আর সেই উপভোগ থেকে বঞ্চিত হতে চান না ছেলে-বুড়ো কেউই। ব্রাজিল জিতলে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের, আবার আর্জেন্টিনা জিতলে ব্রাজিল সমর্থকদের বাড়ির সামনে গিয়ে আনন্দ-উল্লাস করা যেন নিত্য ঘটনা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও চলে এমন ঠাণ্ডা যুদ্ধ। অনেকে প্রিয় দলের পক্ষে সুন্দর সুন্দর স্ট্যাটাস দেন। বাংলাদেশের বিশ্বকাপ মানেই যেন ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা। এবার সেই আনন্দে ভাটা পড়েছে নকআউট পর্ব থেকে মেসিদের বিদায়ে। প্রায় ১০ হাজার মাইল দূরের দেশ আর্জেন্টিনা। এই দলটির বিদায়ে যেন অর্ধেক বিশ্বকাপই শেষ হয়ে গেল বাংলাদেশের। কেননা তাদের সমর্থকই যে সবচেয়ে বেশি।

বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেই ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার পতাকায় ছেয়ে যায় দেশ। রাস্তার পাশের দেয়াল থেকে শুরু করে বাড়িঘর আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের পতাকার রঙে নতুন রূপ পায়। প্রিয় দলের জার্সি পরার প্রতিযোগিতা তো রয়েছেই। জায়ান্ট স্ক্রিনে একসঙ্গে হৈহুল্লোড় করে খেলা দেখা যেন তরুণ-তরুণীদের কাছে ঈদের আনন্দের চেয়েও বেশি। দলের জয়ে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস এবং পরাজয়ে বেদনায় মলিন চেহারা নিয়ে ফেরার দৃশ্যও পরিচিত। আর্জেন্টিনার সমর্থকরা এখন চুপ। হতাশায় মোড়ানো। পারেননি মেসি, পারেনি আর্জেন্টিনা। সমর্থকদের হৃদয় ভেঙে চোখের জলে বিদায় নিল প্রিয় দল।

বাংলাদেশের সাবেক ফুটবলার কায়সার হামিদের প্রিয় দল ব্রাজিল। আবার মেসির খেলাও পছন্দ করেন। আর্জেন্টিনা এমন বিদায় মানতে পারছেন না তিনিও। কায়সার হামিদের মতে, ‘আর্জেন্টিনার ফুটবলকে মানুষ অনেক ভালোবাসে। তাদের খেলা প্রাণ দিয়ে উপভোগ করে। বিশ্বকাপের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের আগ্রহ আসলেই কমে গেল মেসিরা বাড়ির পথ ধরায়।’ ব্রাজিল বিশ্বকাপে মেসিদের হারের শোক এখনো বাংলাদেশ জাতীয় দলের ফুটবলার রায়হানের হৃদয় বিদীর্ণ করে। এবারও প্রিয় খেলোয়াড় মেসি ও আর্জেন্টিনার পারফরম্যান্সে মন খারাপ তার। রায়হানের মতে, ‘আর্জেন্টিনা আর মেসির প্রতি মানুষের যে আশা-প্রত্যাশা, তা কোনো মতেই পূরণ করতে পারেননি। কতটা খারাপ লাগছে বোঝাতে পারবো না।’

বাংলাদেশ জাতীয় নারী বয়সভিত্তিক দলের অধিনায়ক মারিয়া মান্দার প্রিয় দল আর্জেন্টিনা। মেসি প্রিয় খেলোয়াড়। আর্জেন্টিনা বিদায় নেওয়ায় বিশ্বকাপের বাকি ম্যাচগুলো আর দেখবেন না বলে জানান এ ফুটবলার। হকি তারকা ফরহাদ আহমেদ সিটুল ব্রাজিলের সাপোর্টার হলেও মেসির ভক্ত। তিনি মনে করেন, ‘আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপের গ্রুপপর্ব থেকে বিদায় নেওয়ায় বিশ্বকাপের আমেজও শেষ হয়ে গেল। আমি চেয়েছিলাম ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপের শেষ পর্যন্ত থাকুক এবং চ্যাম্পিয়ন হোক ব্রাজিল, কিন্তু আর্জেন্টিনা পারলো না। বাংলাদেশের বিশ্বকাপই অর্ধেক শেষ হয়ে গেল।’

গত বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলেছিল আর্জেন্টিনা। এবার শেষ ষোলো থেকেই বিদায় নিল মেসির দল। আর্জেন্টিনার প্রতি সমর্থকদের ভালোবাসার কারণ ব্যাখ্যাতীত। ম্যারাডোনা আর মেসির আবেগ উতলানো জোয়ারে ভেসে যান সমর্থকরা। সেই আবেগ যেন নাড়ির বন্ধন হয়ে গেছে। তারা মনে করেন, কিছু না পাওয়ার প্রত্যাশা করে ভালোবাসাই হলো বিশুদ্ধতম ভালোবাসা। আর্জেন্টিনা সমর্থকদের ভালোবাসা ঠিক একই রকম। আর্জেন্টিনা যেন অহঙ্কারী প্রেমিক। সব সময় প্রেমিকাকে কাঁদায়! চোখের জল যেন শুকাতেই দেয় না।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here