ভারতে প্রতি ১৩ মিনিটে একজন নারী ধর্ষিত হন- এই পরিসংখ্যান কর্তৃপক্ষের। এই তুলনায় এসব ধর্ষণের বিচার হচ্ছে খুবই কম। সাজা হওয়ার ঘটনা তো আঙ্গুলে গোনার মতো।

ধর্ষণের শিকার এরকম বহু নারী বিচার চেয়ে লড়াই করছেন। তাদের কারো কারোর এই লড়াই চলছে বছরের পর বছর।

এরকম একজন নারী ১৬ বছর বয়সী ললিতা (এটি তার আসল নাম নয়। তার অনুরোধে নামটি বদলে দেয়া হয়েছে)। ললিতার জীবন তার বয়সী অন্যান্য নারীদের চেয়ে আলাদা।

তার পরিবারের পরিচিত এক পুরুষ তাকে ধর্ষণ করার পর তিনি ২০১৬ সালে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। তারপর তার এক ছেলের জন্ম হয়। ছেলেটির বয়স এখন দেড় বছর।

ললিতার জন্ম উত্তর প্রদেশের একটি গ্রামের দরিদ্র এক দলিত পরিবারে। তারা দুই বোন। তিনি সবার ছোট। মা মারা গেছেন আগেই। পিতা একজন নিরক্ষর দিনমজুর।

যার বিরুদ্ধে ধর্ষণ করার অভিযোগ, তিনি তার পিতার একজন বন্ধু। তার বয়স ৫৫। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ যে বন্ধুর মেয়েকে উত্তর প্রদেশের রাজধানী লখনৌতে নিয়ে যাওয়ার সময় পথে ছুরি ধরে ললিতাকে ধর্ষণ করেছেন তিনি।

ললিতার বাবাকে তিনি বলেছিলেন, সরকারি কিছু অর্থ সাহায্য পেতে যদি আবেদন করা হয় তাহলে মেয়ের বিয়ে দিতে আর কোনো অসুবিধা হবে না।

ললিতা জানান, বাড়িতে ফিরে ধর্ষণের ব্যাপারে তিনি তার পিতা কিম্বা বোন কাউকে কিছু বলেননি। কিন্তু এর কয়েক মাস পরেই তার অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার বিষয়টি যখন আর চেপে রাখা যাচ্ছিল না, তখন ধর্ষণের ঘটনা জানাজানি হয়ে যায়। আশেপাশের মহিলারা তাকে এবিষয়ে প্রশ্ন করতে শুরু করলে ললিতা তাদের জানান লখনৌতে যাওয়ার পথে তার জীবনে কী ঘটেছিল।

‘আমি তাকে জেলখানায় দেখতে চাই। আর কিছু না,’ বলেন ললিতা।

এরপর তার দিনমজুর পিতা ২০১৬ সালের ২৪ জুন পুলিশের কাছে একটি অভিযোগ দায়ের করেন। এর মধ্যে ধর্ষণের ঘটনার পর প্রায় ছ’মাস কেটে গেছে। কিন্তু তারও দু’বছর পর গত ২০ জুন গ্রেফতার করা হয়েছে অভিযুক্ত ধর্ষণকারীকে।

এই ধর্ষণের মামলা তদন্তে দেরি হচ্ছে- বিবিসির এসংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পরেই তাকে গ্রেফতার করা হলো।

কিন্তু এই গ্রেফতারের আগ পর্যন্ত অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো মামলাও করা হয়নি। পুলিশ বলছে, তারা ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফলের জন্যে অপেক্ষা করছিল।

একজন পুলিশ অফিসার বিবিসি হিন্দিকে বলেছেন, ডিএনএ রিপোর্টে পেতে দেরি হওয়ার কারণে শুধুমাত্র লখনৌতে সাড়ে পাঁচ হাজার মামলা ঝুলে আছে।

ললিতা তো তাও তার ধর্ষণের কথা প্রকাশ করেছেন। তার পিতাও শেষ পর্যন্ত পুলিশের কাছে গেছেন। কিন্তু ভারতে বহু নারী আছে যারা কখনোই তাদের ধর্ষিত হওয়ার হওয়ার কথা প্রকাশ করে না। পুলিশের কাছে যাওয়া তো আরো দূরের কথা।

আর যেসব নারী ধর্ষণের কথা প্রকাশ করেন এবং বিচার চাইতে কর্তৃপক্ষের দ্বারস্থ হন তাদেরকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। বিচার চাওয়ার এই সংগ্রাম কখনো কখনো চলতে থাকে বছরের পর বছর।

তারা বলেন, পুলিশ, আদালতসহ পুরো রাষ্ট্র ব্যবস্থাই খুব ধীর গতিতে কাজ করে। দ্রুত বিচার সম্পন্ন করার ব্যাপারে এসব প্রতিষ্ঠানকে খুব একটা সক্রিয় হতেও দেখা যায় না।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এর একটি কারণ পুলিশ বিভাগে লোকবলের অভাব, তাদেরকে প্রচুর কাজ করতে হয় এবং তাদের বেতনও খুব কম। একই সাথে আদালতে জমে আছে বহু মামলা।

কিন্তু ললিতার মতো ভিকটিম, যারা দরিদ্র এবং নিরক্ষর, তাদের অবস্থা আরো খারাপ। আর দলিতের মতো অচ্ছুৎ সম্প্রদায়ের নারী হলে তো কথাই নেই।

কিন্তু সম্প্রতি এই দলিত নারীদের রক্ষায় নতুন একটি আইন হয়েছে ভারতে। সেখানে বলা হয়েছে, কোনো নারী ধর্ষণের শিকার হলে তাকে বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, যার পরিমাণ প্রায় পাঁচ লাখ রুপী। আর গণধর্ষণের শিকার হলে ওই নারীকে আট লাখ রুপী ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

নতুন আইনে পুলিশের পক্ষ থেকে ধর্ষণের ঘটনা মামলা হিসেবে গ্রহণের পরেই ওই নারীকে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অভিযুক্তের সাজা হওয়ার আগেই ধর্ষিতা নারীকে এই ক্ষতিপূরণ দেয়ার কথা বলা হয়েছে।

কিন্তু ললিতা এবং তার পিতা বলেছেন, তারা কোনো ক্ষতিপূরণ পাননি এবং তারা যে এরকম একটা ক্ষতিপূরণ পেতে পারেন সে সম্পর্কেও তারা কিছু জানেন না। তারা বলেন, কেউই তাদেরকে এবিষয়ে কখনো কিছু বলেনি।

এও জানা গেছে, পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করার ২৫ দিনের আগ পর্যন্তও ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে ললিতার বক্তব্য রেকর্ড করা হয়নি। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের আদেশ অনুসারে, অভিযোগ দায়েরের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ভিকটিমের বক্তব্য রেকর্ড করতে হবে। যদি দেরি হয় তাহলে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে লিখিতভাবে দেরি হওয়ার কারণ সম্পর্কে জানাতে হবে।

‘অর্থই ক্ষমতা’
ললিতার মামলার তদন্তে কেনো অগ্রগতি নেই, ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে তার বক্তব্য রেকর্ড করতে কেন এতো দেরি হলো এবং তাকে কেন ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি – এসব বিষয় জানতে বিবিসি হিন্দির সাংবাদিক স্থানীয় পুলিশ থেকে শুরু করে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের মতো সরকারি কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন।

তখন তাকে এক অফিস থেকে পাঠানো হয়েছে আরেক অফিসে। কেউই তার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি। কিন্তু তারা সবাই এই সমস্যাটির কথা স্বীকার করেছেন।

একজন পুলিশ অফিসার তাকে এও বলেছেন, ‘আমাদের আরো দু’বছর আগেই ক্ষতিপূরণ দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেটা কোনো ব্যাপার না, এটা আমরা আগামীকালই পাঠিয়ে দেব।’

ললিতার বয়স নিয়ে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে যে বক্তব্য দেয়া হয়েছে তার সাথে পুলিশের অভিযোগে উল্লেখ করা বয়সের মিল নেই।

ললিতার বাবা বলছেন, তার মেয়েকে যখন ধর্ষণ করা হয় তখন ললিতার বয়স ছিল ১৪, ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দেয়া বক্তব্যেও ১৪, কিন্তু পুলিশের অভিযোগে ললিতার বয়স উল্লেখ করা হয়েছে ২০।

পুলিশ বলছে, মেডিক্যাল পরীক্ষায় ললিতার বয়স ২০ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, মেডিকেল রিপোর্ট কখনো মিথ্যা বলতে পারে না।

কিন্তু অভিযোগ উঠেছে যে, কেউ একজন ললিতার বয়স বাড়িয়ে লিখেছে। কারণ ভিকটিমের বয়স যদি ১৮ বছরের নিচে হয় তাহলে আরো কিছু আইনেও অভিযুক্তের বিচার হতে পারে। এই অভিযোগ অবশ্য পুলিশ অস্বীকার করেছে।

ললিতার পিতা বলেছেন, পুলিশের তদন্তের উপর তার কোনো আস্থা নেই। তিনি অভিযোগ করেছেন যে, অভিযুক্ত ব্যক্তি ‘টাকা-পয়সা ও ক্ষমতা দিয়ে সবকিছু ম্যানেজ করে নিয়েছে।’

তিনি জানান, তার মেয়েকে ধর্ষণের বিচার চেয়ে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার কাছে গিয়েছিলেন কিন্তু গত দু’বছরে তাকে সাহায্য করতে কেউ এগিয়ে আসেনি।

পরে এক আত্মীয়ের সাথে ললিতার বিয়ে হয়েছে। ললিতার স্বামী তার সন্তান প্রসব ও চিকিৎসার খরচ দিয়েছেন।

ললিতাকে ধর্ষণের তদন্তে গড়িমসি নিয়ে বিবিসি হিন্দির খবর প্রকাশের পরদিনই অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়। এই ঘটনায় নতুন করে তদন্তও শুরু হয়েছে।

গ্রাম কাউন্সিলের প্রধান জানিয়েছেন, ম্যাজিস্ট্রেট নতুন করে ললিতার বক্তব্য রেকর্ড করেছেন এবং তার ক্ষতিপূরণ পাওয়ার ব্যাপারেও ব্যবস্থা নিচ্ছেন।

এখন অভিযুক্ত ধর্ষণকারীর বিচারের অপেক্ষা। -বিবিসি

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here