প্রতিটি ডিভোর্সেই সন্তানরা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তাদের সবারই অনুভূতি একই রকম বলে মন্তব্য করেছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, ‘হয়তো এ দুটি বাচ্চা আজকে আমাদের সঙ্গে অনুভূতি প্রকাশ করার সুযোগ পেয়েছে। সারা দেশের ডিভোর্স দম্পতির সব বাচ্চারই অনুভূতি কিন্তু একই। তারা সেটা প্রকাশ করতে পারে না। এ বাবা মা শুনতে পেলেও অন্য বাচ্চারে অনুভূতি কানে পৌঁচ্ছাছে না। ধ্রুব ও লুব্ধ যে অনুভূতি প্রকাশ করেছে তা এই সমাজের প্রতি একটি বার্তা।’

ডিভোর্সি এক দম্পতিকে উদ্দেশ্য করে বুধবার এমন মন্তব্য করেছেন হাইকোর্টের বিচারপতি জেবিএম হাসান ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ। আদালত বলেন, ‘আপনারা হলেন উচ্চ শিক্ষত। আপনারাই হতে পারেন সমাজের উদাহরণ। নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন মানুষের কাছে কি বার্তা গেছে? আপনাদের দিকে তাকিয়ে আছে সবাই। আপনাদের একটি সিদ্ধান্ত সমাজের প্রতি উদাহরণ হয়ে থাকবে।’

এর আগে গত ২৫ জুন ১২ বছর বয়সী ধ্রুব, ৯ বছর বয়সী লুব্ধ ও তাদের ডিভোর্সী বাবা-মায়ের উপস্থিতিতে হাইকোর্টে এক হৃদয় বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। দুই শিশুর অনুভূতি ও বাবা-মাকে জড়িয়ে হাউমাউ করে কান্না শুনে আালতে উপস্থিত বিচারপতি, আইনজীবী, গণমাধ্যমকর্মীসহ সবার চোখেই জল আসে। একপর্যায়ে আদালতের জিজ্ঞাসার জবাবে বড় ছেলে ধ্রুব বলে, ‘আমরা আর কিছু চাই না। বাবা-মাকে একসঙ্গে দেখতে চাই। একসঙ্গে থাকতে না পারলে বাবা-মা হয়েছে কেন? একসঙ্গে না হতে পারলে আমরা কারও কাছেই যাবো না।’

বড় ছেলের এমন বক্তব্যের পর ওই দম্পতিকে খাস কামরায় নিয়ে কথা বলেন আদালত। তারা পুনরায় দাম্পত্য জীবন শুরু করতে রাজি হন। পরে আদালত তাদের সম্পর্ক উন্নয়নে ৪ জুলাই পর্যন্ত শিশু সন্তানদের মায়ের হেফাজতে রেখে বাবাকে দেখাশোনা করার অবারিত সুযোগ দেন। ৪ জুলাই পরবর্তী দিন ঠিক করে শিশু দুটিসহ ওই দম্পতিকে হাজির হতে নির্দেশ দিয়ে শুনানি মুলতবি করেন।

ওই আদেশ অনুযায়ী সবাই হাজির হলে আদালত বলেন, ‘পরিস্থিতির কি কোনো উন্নতি হয়েছে?’ তখন শিশু দুটির বাবার পক্ষের আইনজীবী তাপস কান্তি বলেন, ‘হ্যাঁ, কিছুটা উন্নতি হয়েছে। ছুটি নিয়ে মা বাচ্চারে সঙ্গে ঘুরেছেন। বাবাও বাচ্চাদের সময় দিয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে একটি সমস্যাও দেখা দিয়েছে। ছোট বাচ্চাটি এক রাতে তার বাবাকে মায়ের বাসায় থেকে যাওয়ার আবদার জানালে বাবা রাজি হলেও মা রাজি হননি। রাত ১টায় বৃষ্টির মধ্যেই তাকে বের হয়ে যেতে হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘পারিবারিক সমস্যার কারণে ব্যাংকে অভিযোগ দেয়ায় ২০১৬ সালে ডিসেম্বরে বাবার চাকরি চলে যায়।’

এই সময় আদালত বলেন, ‘এ ঘটনায় মিডিয়ায় কিভাবে গিয়েছে দেখেছেন? এটা একটি স্পর্শকাতর বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।’ তখন তাপস কান্তি বলেন, ‘বাবা শিশুদের কাছে সারেন্ডার করেছেন। বাচ্চারা যেভাবে চাইবেন তিনি সেটাই করবেন।’

আদালত বলেন, ‘এটাকে কি পরিস্থিতির উন্নতি মনে করেন?’ তাপস কান্তি বলেন, ‘কিছু তো উন্নতি হয়েছে।’ পরে মায়ের আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘এটা পুরোপুরি পারিবারিক ইস্যু। সুতরাং দুজনের মধ্যেই সম্পর্ক উন্নয়নে আরো সময় লাগবে।’ তখন আদালত বলেন, ‘ঠিক। এটাতো রাতারাতি উন্নতি হবে না।’

রুহুল কুদ্দুস বলেন, ‘বাচ্চা দুটি ইতিমধ্যে ঢাকায় স্কুলে ভর্তি হয়েছে। ওরা খুশি। প্রতিনি মা স্কুলে আনা-নেয়া করছেন।’

এ সময় আদালত বলেন, ‘ঠিক আছে, কিন্তু মনে রাখতে হবে, বাচ্চাদের অভিপ্রায় উপেক্ষা করে স্কুলে ভর্তি করলে হয় না।’ তখন রুহুল কুদ্দুস বলেন, ‘এ ঘটনা গণমাধ্যমে আসার পর তারা যেখানে গিয়েছে সেখানেই বলেছে তোমরা পূন্যের কাজ করেছো। আদালতের প্রতি মানুষের উচ্চাকাঙ্খা বেড়ে গেছে। শিশুদের কল্যাণ বিবেচনায় পারিবারিক বন্ধন অটুট রাখতে কোর্ট সমঝোতার জন্য সময় দিয়েছে। এটা সর্বমহলে বার্তা দিয়েছে। তবে উভয়পক্ষকে মনে রাখতে হবে, আদালতের নমনীয়তায় যদি তারা অন্যকিছু ভেবে থাকেন, তাহলে সেটা ঠিক হবে না। মনে রাখতে হবে, আদালতের হাত খাটো না। বাচ্চাদের মঙ্গল চিন্তা করে আদালত যে কোনো আদেশ দিতে পারেন।’

অ্যাডভোকেট তাপস কান্তি তখন বলেন, ‘বাচ্চারা যদি চায় বাবাকে যেন বাসায় থাকার অনুমতি দেয়া হয়। প্রয়োজনে ড্রয়িং রুমে থাকবেন।’ তখন আদালত বলেন, ‘অপেক্ষা করুন, সমঝোতা হয়ে গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে।’ এরপর আদালত শিশু ধ্রুব ও লুব্ধকে এজলাসের সামনে ডাকেন। ওরা এগিয়ে গেলে জ্যেষ্ঠ বিচারপতি বলেন, ‘কেমন আছো তোমরা? আব্বু বাসায় যায়?’ উত্তরে দুই শিশু বলে, ‘ভালো আছি। হ্যাঁ, আব্বু বাসায় আসেন।’ বিশ্বকাপে কে কোন দল সাপোর্ট করে বিচারপতিরা এমন প্রশ্ন করলে ধ্রুব জানায়, সে ব্রাজিলের সাপোর্টার আর লুব্ধ বলে, সে আর্জেন্টিনার।

অবশেষে আদালত ধ্রুব ও লুব্ধর মা-বাবাকে সামনে ডাকেন। তারা এগিয়ে এলে জ্যেষ্ঠ বিচারপতি বলেন, ‘আপনাদের এই বিষয়টি মিডিয়ায় এসেছে। আপনারা উচ্চ শিক্ষিত মানুষ। সবাই কিন্তু আপনাদের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছে। আপনাদের একটি সিদ্ধান্ত সমাজের প্রতি উদাহরণ হয়ে থাকবে।’

এরপর আদালত এ বিষয়ে পরবর্তী আদেশের জন্য ১ আগস্ট দিন ধার্য করেন। আদালত বলেন, ‘সমঝোতা প্রক্রিয়ার উন্নতি হয়েছে। আরও উন্নতির জন্য দুই পক্ষই সময় চেয়েছেন। সময় দেয়া হলো।’

২০০২ সালে রাজশাহীর মেয়ে কামরুন্নাহার মল্লিকা এবং মাগুরার মহাম্মদপুরের মেহেদী হাসান বিয়ে করেন। মল্লিকা পেশায় স্কুল শিক্ষিক। আর মেহেদী বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা। দাম্পত্য কলহের কারণে গত বছরের মে মাসে নোটিসের মাধ্যমে বিয়ে বিচ্ছেদের প্রক্রিয়া শুরু করেন তারা। এ ঘটনার কিছুদিন আগে দুই সন্তানকে মাগুরায় গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে দেন মেহেদী।

বোনের তত্ত্বাবধানে জেলা শহরের একটি স্কুলে তাদের ভর্তি করিয়ে দেন। এরপর থেকে দুই সন্তানের দেখা না পেয়ে তাদের মা বাচ্চা দুটি নিজ হেফাজতে নেয়ার দাবিতে হাইকোর্টে আবেদন করেন। এ আবেদনের পর গত ২৯ মে শিশু দুটিকে হাইকোর্টে হাজির করতে সংশ্লিষ্ট থানার পুলিশ ও বাবা মেহেদীকে নির্দেশ দেন। পরে ২৫ জুন তাদের হাজির করা হয়।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here