নিজেদের সন্তান নেই মাগুরা সদর উপজেলার বগুড়া গ্রামের নওশের আলম ও মাহমুদা আলমের। একটি সন্তানের জন্য তাদের দু’জনেরই ছিল হাহাকার। কিন্তু বহু চিকিৎসা করেও কোনো লাভ হয়নি। তাই হাল ছেড়ে দিয়ে এই দম্পতি গ্রামের অন্যান্যদের ছেলে-মেয়ের মাঝে খুঁজতে থাকেন নিজেদের সন্তানের ছায়া।

আর তাই গ্রামের শিশুদের আলোকিত ও শিক্ষিত করে তুলতে নিভৃত ওই গ্রামেই তারা প্রতিষ্ঠা করেন বগুড়া আদর্শ শিশু বিকাশ কিন্ডারগার্টেন। এই স্কুলে তারা শতাধিক ছেলেমেয়েকে প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ দিয়ে চলেছেন বিনা খরচে। বর্তমানে এ বিদ্যালয়ে ৭৫ জন শিক্ষার্থী বিনা খরচে লেখাপড়া করছে।

নওশের আলম জানান, ১৯৮২ সালে যশোর শহরের ঘোপপাড়ার মাহমুদা বেগমের সঙ্গে বিয়ে হয় তার। সংসার জীবনের ১৫ বছরেও সন্তান লাভে ব্যর্থ হওয়ায় তাদের মধ্যে হতাশা ভর করে। তাই সন্তানের অভাব ঘোচাতে বিনা খরচে অন্যের সন্তানকে শিক্ষিত করে তোলার সিদ্ধান্ত নেন তারা। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নওশের আলম তার পৈতৃক সূত্রে পাওয়া ৫৫ শতক জমির ওপর গড়ে তোলেন বগুড়া আদর্শ শিশু বিকাশ কিন্ডারগার্টেন। ১৯৯৮ সালে ১২ শিক্ষার্থী নিয়ে বিদ্যালয়টির যাত্রা শুরু। বর্তমানে এখানে পড়ালেখা করা ৭৫ শিক্ষার্থীর সবাই হতদরিদ্র পরিবারের।

নওশের ও মাহমুদার এ মহতি উদ্যোগে সঙ্গী হয়েছেন স্থানীয় আরও কয়েকজন। তাদের একজন পার্শ্ববর্তী এলাকার ফুলবাড়ী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সাবেক সহকারী শিক্ষক কাজী আসাদুজ্জামান। বর্তমানে তিনি কিন্ডারগার্টেনটির প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বলেন, ‘নওশের ও মাহমুদাই এ স্কুলের সম্পূর্ণ ব্যয়ভার বহন করেন। তাদের ত্যাগে উৎসাহিত হয়ে ফুলবাড়ী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের আমরা পাঁচ শিক্ষক মিলে স্বেচ্ছায় তাদের স্কুলে পড়াই। তারপরও তারা বিভিন্ন উৎসবে আমাদের উপহার দিয়ে সম্মানিত করেন।’

স্কুলের শিক্ষিকা জুলেখা খাতুন জানান, নওশের-মাহমুদা দম্পতির অপত্য স্নেহ ভালবাসায় মুগ্ধ হয়ে অনেকটা বিনা পারিশ্রমিকেই এ মহৎ কাজের সাথে দীর্ঘদিন রয়েছি।

স্থানীয় বাসিন্দা টিপু সুলতান জানান, অতিথিপরায়ণ নওশের ও মাহমুদা দম্পতি এলাকায় সাদা মনের মানুষ হিসেবে পরিচিত। তাদের পারিবারিক আয়ের একটি অংশ স্কুলের জন্য ব্যয় করেন। তারা বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের খাতা, কলম, পেন্সিল ছাড়াও প্রয়োজনে জামাকাপড় কিনে দেন।

চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী রিফাত হোসেন জানায়, স্কুলে আসলে স্যার, মেডাম আমাদের আমাদের অনেক আদর করেন। তারা আমাদের দেশ ও মানুষকে ভালবাসতে শেখান।
সদা হাস্যোজ্জ্বল নওশের আলম বলেন, ‘শৈশবকাল মানুষের মধ্যে নৈতিকতা, সৃজনশীলতা ও দেশপ্রেম প্রথিত করার উপযুক্ত সময়। সে কারণেই শিক্ষাকে এলাকার গরিব শিশুদের নাগালের মধ্যে আনার লক্ষ্য নিয়েই এ স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেছি।’

মাহমুদা আলম বলেন, একসময় সন্তান না হওয়ার কারণে কষ্ট পেতাম। কিন্তু এ স্কুলের মাধ্যমে আমরা শত শিশুর মা-বাবা হওয়ার সুযোগ পেয়েছি।

কিন্তু তৃপ্তির সঙ্গে নওশের-মাহমুদা দম্পতির হতাশাও রয়েছে। তারা বলেন, আমাদের বয়স হয়েছে, ভবিষ্যতে থাকবো না। আমাদের স্কুলটি যেন টিকে থাকে। নিজেদের সাধ্যমতো টিনের চাউনি আর চাটাইয়ের বেড়ার মধ্যে শিক্ষা কার্যক্রম চলছে। ইটের তৈরি কোনো দালান করা আমাদের পক্ষে আর সম্ভব নয়। তবে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অবকাঠামোগত উন্নয়নে এগিয়ে আসে তাদের কাছে কৃতজ্ঞ থাকব।

স্থানীয়রা জানান, নওশের-মাহমুদা দম্পতি সামাজিক কার্যক্রমের পাশাপাশি অতিদরিদ্র পরিবারের দুইজন কন্যাকে নিজেদের পরিচয়ে বড় করে বিয়ে দিয়েছেন।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here