প্রিয় লিও,
ভালো নেই হয়তো। তবু লিখছি। কী করব বলো। আমিও তো ভালো নেই। বিশ্বকাপের পর দেশে ফিরে যাওনি। একা ফিরেছ বার্সায়। রাশিয়া থেকে সোজা স্পেন, কাজান থেকে ন্যু ক্যাম্প। যেখানেই থাক, দুরত্ব যতই হোক। আনন্দ-বেদনার প্লাবন যে বয়ে বেড়ায় সবখানেই।

বছর এগার আগে ক্রীড়া সাংবাদিকতায় আমার হাতেখড়ি। ঠিক যখন তুমি বার্সায় আগমনী গান শোনাচ্ছ। তখনও ১০ নম্বর জার্সি পাওনি। সেটা পড়ে তখন রোনালদিনহো। এরপর রাইকার্ডের বিদায়, গার্দিওলার বার্সা অধ্যায় শুরু। তুমিও পেয়ে গেলে ১০ নম্বর জার্সি। শুরু হলো লিও অধ্যায়। একটি একটি বছর যাচ্ছে, তোমার পায়ের ধার যেন বাড়ছে। রাত জেগে খেলা দেখি তোমার, পরের দিন রিপোর্ট করি। সেখান থেকেই তো তোমার প্রতি মুগ্ধতার শুরু। লম্বা চুলের একহারা মেসির ক্ষিপ্র গতি, আহ চোখে লেগে আছে এখনো।

২০০৯ সালে ব্যালন ডি অর ও ফিফা বর্সসেরা দুটোই জিতলে। তোমাকে নিয়ে আশার জাল বুনলাম ২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে। পাগলা ম্যারাডোনার কোচিংয়ে উঠলে কোয়ার্টারে। তারপর জার্মান বিষাদ। মনটা ভেঙে গেল। ভাবলাম পরের বার হবে। ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপের আগে তোমার নামের পাশে চারটি ফিফা বর্ষসেরার খেতাব জ্বলজ্বল করছিল। আশার পালে লাগল জোর হাওয়া। গ্রুপ পর্ব থেকে নক আউট, কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমি অতঃপর ফাইনাল। উত্তেজনার পারদ তখন তুঙ্গে। বাড়ল হৃদস্পন্দন। এবার কাপটা হয়তো পেয়েই যাচ্ছ তুমি। কিন্তু হলো না। এবারও জার্মানি। গোটশের শেষ সময়ের গোল হৃদয়টা ক্ষতবিক্ষত করে দিল।

ক্লাব লেভেলে সবচেয়ে ভালো ফর্ম নিয়ে রাশিয়া বিশ্বকাপে এলে তুমি। আবারও রঙীন স্বপ্নের ডানামেলা। কিন্তু গ্রুপ পর্বেই যে টালমাটাল অবস্থা, স্বপ্নে লাগল শঙ্কার আচর। তারপরও উঠলে নক আউট পর্বে। ভাবলাম, জেগে উঠবে তুমি, তোমার সঙ্গে আর্জেন্টিনাও। হলো না। এবার ফরাসি তারুণ্যের গতির কাছে পরাস্ত তুমি, তোমার আর্জেন্টিনা, আমার আর্জেন্টিনা।

ব্রাজিল বিশ্বকাপের ফাইনালের পর তুমি কেঁদেছিলে মেসি, আমিও। এবার কাঁদনি। আমিও। মনে আছে ফ্রান্সের কাছে হারার পর কাজান অ্যারিনায় নিশ্চল, নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়েছিল কোমড়ে দুই হাত চেপে। চোখে উদাস দৃষ্টি, যেখানে অশ্রু গড়াতে দেখা যায়নি। তবে হৃদয়ে চলেছে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ঝড়। আমিও সবার সঙ্গে স্বাভাবিক আচরণ করেছি। কিন্তু বুকের বা দিকে ঠিকই চিনচিন করেছে লিও। কী করে বুঝাই তোমাকে।

বিশ্বকাপের আগে তোমার পেছন ফেরা একটি ছবি ফেসবুকের কভার ফটো বানিয়েছিলাম। ক্যাপশনে লিখেছিলাম, ‘দরকার হলে আবার কাঁদব, তবু হৃদয়ে লেখা নাম মুছে যাবে না।” অনেকে বাহবা দিয়েছিল। অনেকে টিপ্পনি কেটে উপহার দিয়েছিল টিসু বক্সও। কিছুই আমলে নেইনি। বিশ্বাস ছিল, তোমার প্রতি। তুমি বিশ্বকাপ জিততে পারনি, কেন জানি আমার কুসংস্কার মনটা নিজেকেই দায়ী করছে। বললে, তুমি ভাববে আমি ব্যাকডেটেড। কিন্তু তাই তো হলো। ব্রাজিল বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার প্রতিটি ম্যাচ আমি অফিসে দেখেছি, জিতেছ তোমরা। ফাইনালের রাতে হঠাত আমি অসুস্থ। বাসায় পেটের ব্যথা নিয়ে দেখলাম তোমাদের ম্যাচ। তোমার কান্নায় শরিক হলাম আমিও।

এবার তাই ভেবেছিলাম তোমাদের প্রত্যেকটি ম্যাচ দেখব অফিসে, রিপোর্টও করব। কিন্তু ঈদের ছুটির দিনে বাসায় দেখলাম আইসল্যান্ডের সঙ্গে ড্র। ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে হারার ম্যাচেও ছিলাম বাসায়। রাগে গা জ্বলছিল। নাইজেরিয়ার বিরুদ্ধে বাঁচা মরার ম্যাচ রিপোর্ট হাসিমুখে আমিই করেছিলাম লিও, অফিসে বসে। ফ্রান্সের বিরুদ্ধে নক আউট পর্বের ম্যাচও দেখেছি অফিসে। তবে হায়, মনে প্রাণে বিশ্বাস করা কুসংস্কার বৃথা গেল। আবারো হতাশা, চারদিকে নিস্তব্ধতার গান। বিশ্বকাপ জেতার শেষ সুযোগটা হারিয়ে ফেললে লিও?

যতটা না আর্জেন্টিনা, তার চেয়েও বেশি ভক্ত যেন আমি তোমার মেসি। ম্যারাডোনা বাংলাদেশ চিনত না একসময়। অথচ তুমি এই দেশেই এসে খেলে গেছ। তোমার স্পর্শ এখনো অনুভব করে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের সবুজ ঘাস। তুমি যেন কাছেরই একজন। তোমার অফিসিয়াল ফেসবুকে জায়গা পেয়েছে লাল-সবুজের উন্মাদনা। তোমার প্রতি এদেশের সবার টান তাই প্রবল আত্মিক আর তীব্র অহংকারের।

বার্সার হয়ে কতকিছুই তো জিতেছ। কিন্তু দেখ, আর্জেন্টিনার হয়ে তোমার শোকেস ফাঁকা। গ্রেটেস্ট খেলোয়াড় হিসাবে তোমাকে তুলনা করা হয়। কিন্তু একটা জায়গায় তুমি ধরা, বিশ্বকাপ জেতা হয়নি তোমার। তর্কে তাই আমরা বারংবার পিছিয়ে যাই। তোমার গায়ে লেপ্টে যায় বার্সার পোস্টার, তুমি আর্জেন্টিনার নও, তুমি কাতালানদের। এমন অভিযোগ কী ঠিক মেসি? তুমিই তো দুইবার কোপার ফাইনালে দলকে টেনে তুলেছিলে। একবার বিশ্বকাপের ফাইনাল। কিন্তু নিঃশ্বাস দুরত্বে থাকা ট্রফিতে শুধু চুমুটাই খেতে পারলে না।

মন খারাপ কর না মেসি। যে দলে হিগুয়েন আছে আর রক্ষণভাগ লক্ষিন্দারের বাসর ঘর, সেখান থেকে শিরোপা জেতার আশা করা বোকামিই। তবে হ্যা, শিরোপা জিততে ভাগ্যেরও ছোঁয়া লাগে। যেটা তোমার নেই হয়তো। আর্জেন্টিনা হয়তো দূর ভবিষ্যতে শিরোপা জিতবে। ফাইনালের মঞ্চে উড়বে আকাশী-সাদা পতাকা। শিরোপা ধরে বজ্র চিৎকারে চারপাশ মুখরিত করবে তোমার উত্তরসূরীরা। কিন্তু আফসোস তো একটাই, তোমার হাতেই শোভা পেল না আরাধ্যের ট্রফি। যা দেখতে শুধু আমি কেন, বিশ্বের কোটি কোটি ভক্ত উন্মুখ হয়েছিল।

তুমি হয়তো দেখনি। কাজানে হেরে যাওয়ার দিন। তোমার বড় ছেলে থিয়াগো কিভাবে রেলিংয়ে মাথাটা কাত করে রেখেছিল। বাবার পরাজয় মানতে পারেনি। যা তীব্রভাবে নাড়া দিয়েছিল কিশোর মনটাকে। যেমনটা আমার ছেলে দীপ্রর বেলাতেও। ওর সরল প্রশ্ন, ‘বাবা, ‘আর্জেন্টিনা হেরে গেল। আবার কবে খেলবে মেসি।’ জবাব দিতে কষ্ট হয় লিও।

কষ্টের চোরা স্রোত যেমন বইয়ে যায় আমাদের গোটা বঙ্গ দেশেও। তোমাদের শোকে কয়েকজনতো আত্মহত্যাই করে বসল। যেমন ধামরাইয়ের সুজন সরকার। আকাশী-সাদা জার্সি পরেই নিথর, নিস্তব্ধ। অথচ তার বউয়ের হাতের মেহেদী এখনো মুছে যায়নি। ভাবতে পার মেসি, তোমার জন্য কত আকুলতা, কত ভালোবাসা।

তুমি হয়তো বলবে, আত্মহত্যা মহাপাপ। আমিও বলব তাই। কিন্তু আবেগ কেউ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কেউ পারে না। সাত সমুদ্দর তেরো নদীর ওপার থেকে তুমি হয়তো এই চিঠির কথা জানবেও না। কিন্তু তোমার প্রতি আমাদের ভালোবাসা ও সুখ-দুঃখের স্মৃতি গুলো থেকে যাবে আজীবন।

আমি যখন বুড়িয়ে যাব। তখনও আসবে বিশ্বকাপ। হয়তো মনে পড়বে পাঁচ ফুট সাত ইঞ্চির উচ্চতার এক ফুটবলারকে। নাতিপুতিদের শোনাবো তোমার গল্প। বলব, ‘আহ, মেসি ছিল ক্ষুদে জাদুকরী এক ফুটবলার। কী সুন্দর ড্রিবলিং করত। দেখার মতো ছিল তার শুটিং, নয়নকাড়া বাঁ পায়ের কাজ।’

গল্পের শেষটায় অনুমিতভাবে থাকবে হয়তো শূন্যতা আর হাহাকার, ‘মেসি সবই জিতেছিল, শুধু বিশ্বকাপ ছাড়া।’

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here