শুরু থেকেই টপ ফেবারিটের তকমা গায়ে আঁটা ছিল। যদিও গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে তা দেখা যায়নি। তবে ধীরে ধীরে জেগে উঠে ব্রাজিল, দেখা মেলে নান্দনিক ফুটবলের। শুরু হয় হলুদ উৎসব। নক আউট পর্বে মেক্সিকোকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠা ব্রাজিলের স্বপ্ন যেন পোক্ত হয় হেক্সা মিশনের। কিন্তু শেষ আটে এসে এভাবে নিভে যাবে বাতি, বেলজিক গতির কাছে পরাস্ত হবে ব্রাজিলিয়ান জোগো বনিতা, ভাবতে পারেনি কেউ। আর তাই তো ২-১ গোলের হারে কাজান অ্যারিনায় হলুদ রঙে মিশে যায় বিষাদের ছায়া।

হতাশায় মুখ লুকালেন নেইমার। কস্তা, জেসুস, মার্সেলোদের শরীরটা যেন মিশে যেত চাইল কাজানের সবুজ গালিচায়। বিশ্বাস-অবিশ্বাস আর বিরূপ ভাগ্যের দোলাচালে বিষন্নতায় কাতর কোচ তিতে। গ্যালারিতে ভক্তদের কান্নার রোল। বিশ্বকাপ মঞ্চ থেকে বিদায়ের মুহূর্ত যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না তাদের। কিন্তু পাশেই তখন বৃত্তাকার হয়ে জয়োৎসবে মত্ত বেলজিয়াম। সোনালি প্রজন্মদের কী বাঁধভাঙ্গা উল্লাস। এমন উৎসব তাদেরই মানায়। গত ৫৫ বছর যাদের বিরুদ্ধে জয়হীন ছিল বেলজিয়াম। সেই ব্রাজিলকে পেছনে ফেলে ৩২ বছর পর বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে নাম লিখিয়েছে লুকাকু, ব্রুইনে, কোম্পানিরা।

এই কাজান অ্যারিনায় কয়েকদিন আগেই বিশ্বকাপের মঞ্চ থেকে বিদায় নিয়েছিল আর্জেন্টিনা। এবার ব্রাজিলও। মেসি, রোনালদো, ইনিয়েস্তা, সুয়ারেজের পর বিশ^কাপ থেকে ঝড়ে পড়ল আরও একটি নক্ষত্রের, নেইমার। টপ ফেবারিটের তকমা সঙ্গে নিয়েও পারল না পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। গতবার ঘরের মাঠে সেমিতে উঠলেও এবার কোয়ার্টার ফাইনালেই মিশন শেষ হয়ে গেল পেলের উত্তরসূরীদের।

কাজান অ্যারেনায় শুরু থেকেই ম্যাচে ছিল বারুদে উত্তাপ। ছিল আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণের পসরা। সাত মিনিটেই প্রথম গোলের দেখা পেতে পারত ব্রাজিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য। নেইমারের কর্ণার কিকে কোনমতে পা লাগিয়েছিলেন থিয়াগো সিলভা। কিন্তু বল উচু হয়ে ফিরে আসে পোস্টে লেগে। একটুর জন্য জাল খুজে পায়নি বল। মিনিট চারেক পর আরেকটা কর্নার কিকে বল পেয়েও মাত্র ১০ গজ দূর থেকে ঠিকমতো শট নিতে পারেননি পাওলিনহো।

রক্ষণ ঠিক রেখে আক্রমণ চালায় অন্যদিকে বেলজিয়ামও। ১২ মিনিটে দারুণ সুযোগ পেয়েছিলেন ফেলাইনি। কিন্তু তার শট মিরান্ডার পায়ে লেগে লক্ষভ্রষ্ট। মিনিটখানেক পরই ব্রাজিল শিবিরে ভর করে হতাশার সুর। আত্মঘাতি গোল। বেলজিয়ামের কর্ণার কিকে হেড দিয়ে বিপমুক্ত করতে গিয়ে ব্যর্থ ফার্নান্দিনহো। বল মাথায় লাগাতে পারেনি, পরিবর্ততে বল তার হাতে লেগে জড়ায় নিজেদেরই জালে। ১-০ তে লিড তখন বেলজিয়ামের।

এক গোল হজমের পর আক্রমণের গতি বাড়ায় ব্রাজিল। কিন্তু গোল যেন সোনার হরিণ। ২৬ মিনিটে ইনজুরি কাটিয়ে লে ফেরা রিয়াল ডিফেন্ডার মার্সেলোর শট প্রতিহত করেন বেলজিয়াম গোলরক্ষক কোর্তোয়া। তবে ৩১ মিনিটে ব্রাজিল শিবিরে শেল হয়ে বেধেন ডি ব্রুইনে। মাঝ মাঠ থেকে লুকাকু যেন দুর্দমনীয়। একক প্রচেষ্টায় গতি আর কৌশলকে কাজে লাগিয়ে বল নিয়ে চলে আসেন ব্রাজিলের ডি বক্সের কাছে। পাস নে সতীর্থ ডি ব্রুইনের উদ্দেশ্যে। ভুল করেননি ব্রুইনে। মাপা শটে লক্ষ্যভেদ। পোস্টের কাছ দিয়ে বল জালে। ব্রাজিল গোলরক্ষক এলিসন পাখির মতো ঝাপিয়েও ব্যর্থ। ২-০তে এগিয়ে বেলজিয়াম।

আক্রমণের ধার যেন বেড়ে যায় তখন ব্রাজিলের। কিন্তু সব আক্রমণই যেন মিইয়ে যায় বেলজিয়ামের রক্ষণভাগে কিংবা কোর্তোয়ার ক্ষতার কারণে। ৩৬ মিনিটে যেমন জেসুসের হেড চলে যায় বারের উপর দিয়ে। পরের মিনিটে কুতিনহোর বাঁকানো শট। হতে পারত গোল। কিন্তু চিতার মতো এক লাফ দিয়ে প্রতিহত করলেন বেলজিক গোলরক্ষক। হা হুতাশ সেলেকাও শিবির। ৪১ মিনিটে গোলের সুযোগ তৈরি করেছিল বেলজিয়াম। বক্সের বাইরে থেকে ফ্রি কিকে আবার ব্রুইনে। কিন্তু তার নেয়া শট দক্ষতার সঙ্গে ফিস্ট করে এলিসন বল পাঠিয়ে নে বারের উপর দিয়ে। ২-০ গোলের অগ্রগামিতা নিয়েই প্রথমার্ধের বিরতিতে যায় বেলজিয়াম।

দ্বিতীয়ার্ধের গোলের জন্য মরিয়া ব্রাজিল কী না করেছে। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই সামনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বেলজিয়ামের দুর্ভেদ্য রক্ষণভাগ। কখনো বা কোর্তোয়ার জাদুকরী সেভ। তাই বলে হাল ছেড়ে দেয়নি নেইমাররা। ৭৬ মিনিটে আসে কাঙ্খিত মুহূর্ত। বা প্রান্ত থেকে কুতিনহোর কৌশলি ক্রস, রেনাতো অগাস্তোর মায়াবী হেড, বল পোস্টে বাতাস লাগিয়ে জড়ায় জালে। কোর্তোয়া ঝাপিয়ে পড়েও নাগাল পাননি। ব্যবধান কমে আসে ২-১ এ। ম্যাচে ফেরার আভাস ব্রাজিলিয়ান শিবিরে। গ্যালারিতে ধুক ধুক করে কাঁপছে ভক্তদের হৃদয়।

৮১ মিনিটে ফিরমিনোর একটি শট চলে যায় পোস্টের বাইরে দিয়ে। ৮৪ মিনিটে নেইমারের ক্রসে সম্ভাবনা জেগেছিল গোলের। তবে কুতিনহোর দৃষ্টিকটু শট হৃয় বিদীর্ণ করে ব্রাজিলের ভক্তদের। অতিরিক্ত সময়েও আশায় বুক বেঁধেছিল সবাই। ৯৪ মিনিটে নেইমারের একটি শট চলে যায় বারের একটু উপর দিয়ে। পরের মিনিটে কর্নার কিকে ফিরমিনোর হেডও তাই।

গোল মিসের মহড়ায় এবার ব্রাজিলও ছিটকে পড়ল বিশ্বকাপ থেকে। বেলজিয়ামের গতির ফুটবলের কাছে চূর্ণ হলো ব্রাজিলের হেক্সা জয়ের স্বপ্নও।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here