দিন বদলের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন রোগ আমাদের ঘিরে ধরছে আষ্ঠেপৃষ্ঠে। আর রোগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এক শ্রেণির অসাধু চিকিৎসক ও হাসপাতালগুলোও যেন নেমেছে ব্যবসার ধান্দায়। ফলে প্রায়ই ঘটছে ভুল চিকিৎসায় রোগী মৃত্যুর ঘটনা। এছাড়া ভালো চিকিৎসকের কাছে যেতে হলে রোগীকে গুণতে হচ্ছে সর্বনিম্ন ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা ফি। তাই অনেকেই টাকার অভাবে ভালো চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

তবে এ ক্ষেত্রে উজ্জ্বল ব্যতিক্রম দিনাজপুর শহরের ক্ষেত্রীপাড়ার চিকিৎসক বসন্ত কুমার রায়। এখনো মাত্র ৪০ টাকায় রোগীদের চিকিৎসা সেবা দেন তিনি।

অনেকেই ভাবতে পারেন, গ্রামের পল্লী চিকিৎসক ফি নেন এটাই তো বেশি। কিন্তু না, বসন্ত কুমার মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করা চিকিৎসক। এমবিবিএস শেষ করার পর বন্ধুরা যখন টাকার পেছনে ছুটেছেন, তিনি সেখানে গ্রামের দরিদ্রদের সেবায় নেমে পড়েন।

এখন ডা. বসন্ত কুমারের বয়স পেরিয়েছে ৮০ বছর। কিন্তু তারপরও মানবসেবা থেকে তিনি নীতিচ্যুত হননি। দিনাজপুরে তাকে সবাই তাই বলে গরীবের চিকিৎসক। প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গরীবরাই আসেন তার চেম্বারে, সব সময়ই লাইন লেগে থাকে। যাদের ৪০ টাকা ফি দেওয়ার সামর্থ নেই, চিকিৎসা না দিয়ে তাদেরও ফেরত দেন না তিনি। মৃত্যুর আগ পর্যন্তই ডা. বসন্ত কুমার রায় এ সেবা দিয়ে যেতে চান।

এই মানবপ্রেমিকের জন্ম ১৯৩৯ সালের ১ জানুয়ারি তৎকালীন বৃহত্তর দিনাজপুর জেলার (বর্তমানে পঞ্চগড় জেলা) দেবীগঞ্জের সুন্দন দীঘি গ্রামে। বাবা মধুসুদন রায় ও মা অহল্যা বালার পাঁচ সন্তানের মধ্যে বসন্ত সবার বড়। তিনি দেবীগঞ্জ এনএনএইচ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে এইচএসসি পাসের পর ভর্তি হন রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজে। ১৯৬৫ সালে এমবিবিএস পাস করেন। ১৯৬৭ সালে দিনাজপুর শহরের ক্ষেত্রীপাড়ায় বাড়ি গড়ে তার পাশেই মানুষের সেবার প্রত্যয় নিয়ে একটি চেম্বার খুলেন। তখন এমবিবিএস ডাক্তারের ফি পাঁচ টাকা থাকলেও তিনি রোগিদের কাছ থেকে নিতেন মাত্র দুই টাকা। আবার কেউ টাকা না দিয়ে গেলেও আপত্তি করতেন না। দুই টাকা থেকে বেড়ে বর্তমানে তার ফি ৪০ টাকা। অর্থাৎ ৪৯ বছরে তার ফি বেড়েছে মাত্র ৩৮ টাকা।

অন্য আর দশটা চিকিৎসকের মত টাকার অংকটা না বাড়লেও তার রোগীর সংখ্যাটা বেড়েছে কয়েকগুণ। সকাল থেকে শুরু করে রাত অবধি রোগী দেখেন। শুধু তাই নয়, চেম্বারের সঙ্গে লাগানো রয়েছে একটি ফার্র্মেসি। সেখানে মিলছে সবচেয়ে কম মূল্যের ওষুধ।

বামদিকে ডা. বসন্ত কুমার রায় এবং তার ভাই ডা. তরুন কুমার রায়

বর্তমানে শিশু ও বয়স্ক রোগীর সংখ্যা বেশি থাকলেও অনেকে তিন প্রজন্ম ধরে ডাক্তার বসন্ত কুমারের কাছ থেকে সেবা নিচ্ছেন। গত ১১ মার্চ চিকিৎসা সেবার ৫১ বছর পূর্ণ করেছেন মানবসেবার ব্রত নিয়ে কাজ করা এই চিকিৎসক।

ডা. বসন্তের সঙ্গে ৩৮ বছর ধরে কাজ করছেন তার সহকারী সোলেমান আলী। মানুষের সেবায় তার আবেগটাও কম নয়। বললেন, অনেক বছর ধরেই ওনার (ডা. বসন্ত) সঙ্গে আছি। যত রাতই হোক একটি রোগীকেও তিনি ফেরত দেন না। অনেক ধৈর্য নিয়ে রোগীর সঙ্গে কথা বলেন। তাই অনেক দূর থেকে লোকজন আসে।

১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ভারতের শিলিগুড়ি ও দার্জিলিংয়ের মাঝামাঝি করতোয়া ক্যাম্পে শরণার্থী ও মুক্তিযোদ্ধাদেরও সেবা দিয়েছেন বসন্ত কুমার।

তিনি জানালেন, শরণার্থী-মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা দেওয়ার জন্য ভারত প্রশাসনের সহায়তায় গড়ে তোলা হয়েছিল অস্থায়ী হাসপাতাল। চিকিৎসক এবং নার্সদের সহায়তা নিয়ে সেখানে যুদ্ধকালীন চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়।

সম্প্রতি দিনজপুরের চিরিরবন্দরে এবি ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ডা. বসন্ত কুমার রায়কে চিকিৎসা সেবায় অসামান্য অবদান রাখায় সংবর্ধনা দেয়া হয়। প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়িদ তার হাতে তুলে দেন সম্মাননা ক্রেস্ট, পরিয়ে দেন উত্তরীয়। এর আগেও বিভিন্ন সংগঠন থেকে সংবর্ধিত হয়েছেন তিনি।

হিন্দু সম্প্রদায়ে জন্ম নিলেও ডা. বসন্ত কুমার রায় মানবসেবাকে প্রধান ধর্ম মনে করেন। স্বামী বিবেকানন্দের জীবন চর্চাকে নিজের কর্মময় জীবনে প্রয়োগ করে মানবসেবায় নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখেন। সপ্তাহে দুদিন তিনি স্বামী বিবেকানন্দের জীবন দর্শন লাভে দিনাজপুর রামকৃষ্ণ আশ্রমেও যান।

ডা. বসন্ত রায়ের এক ছেলে ও তিন মেয়ে। ছেলে কলেজে শিক্ষকতা করেন। তিন জামাতার মধ্যে একজন চিকিৎসক, একজন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আরেকজন প্রকৌশলী। ডা. বসন্ত রায়ের ছোট ভাইও চিকিৎসক, ডা. তরুন কুমার রায়। তিনিও বড় ভাইয়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করে পাশেই চেম্বার খুলেছেন, ফিও নিচ্ছেন ৪০ টাকা। দুই ভাই মিলেই দিয়ে যাচ্ছেন হতদরিদ্র মানুষের চিকিৎসা সেবা।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here