রাশিয়া মানে হৃদয়ের ভেতর ভিড় করে আসে বৈচিত্র্যময় প্রকৃতির রূপের আধার, বৈকাল হ্রদ, ব্যালে আর সাইবেরিয়ার তুষার মাখা জীবনের ছবি। বিশাল দেশটি যেন আরেকটি পৃথিবী! ছবির মতো সুন্দর হিমশীতল দেশটির প্রকৃতিতে ফুলে ফুলে ভরা চারপাশ। যে কেউ হারিয়ে যাবে কল্পনার জগতে। ক্রিসমাসের তুষার মাখা পাইনগাছের পাশ দিয়ে স্লেজ গাড়ি চালিয়ে যাওয়া সান্তার ছবিটিও নিশ্চয়ই জেগে উঠবে মনের মণিকোঠায়। সেই স্বর্গরাজ্যেই যে চলছে ফুটবল বিশ্বকাপ। বরণ করে নেওয়া হয়েছে

প্রায় ১০ লক্ষাধিক ফুটবলপ্রেমী বিদেশি অতিথিকে। রাস্তায় রাস্তায় সব ফুটবল ফ্যান, রঙ-বেরঙের তাদের সাজ। মানুষগুলোও যে রঙ-বেরঙের! সব মহাদেশেরই মিলনস্থল। মস্কো থেকে সেন্ট পিটার্সবার্গ, সোচিÑ সব শহরেই একই ছবি। মনে হয় যেন রাশিয়াজুড়েই চলছে এক কার্নিভ্যাল। রাশিয়ার প্রেমে মুগ্ধ হয়ে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো তো বলেই ফেলেছেন, ‘আমরা সবাই রাশিয়ার প্রেমে পড়ে গেছি। যারাই এখানে একবারের জন্য এসেছে, তাদের সবাই দেশটিকে যেন নতুন করে আবিষ্কার করেছে।’

বিশ্বকাপ শুরুর আগে কাল মার্ক্সের দেশটিকে নিয়ে বিতর্কের শেষ ছিল না। ভিনদেশী ফুটবলপ্রেমীদের জন্য রাশিয়া মোটেও নিরাপদ নয় বলেও কথা ছড়ায়। রুশ সুন্দরীরা আসলে ছলনাময়ী, কিন্তু এখন বিশ্ব দেখছে এ অপার সৌন্দর্যের মধ্যে রয়েছে এক অসামান্য স্নিগ্ধতা আর আবেশ। শুধু প্রকৃতিই নয়, মন কেড়েছে দেশটির ফুটবলও। সংযুক্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিনিধিত্ব করে ১৯৬৬ সালে একবার সেমিফাইনাল খেলেছে রাশিয়া। সেটাই শেষ সেমিতে ওঠা। সোভিয়েত থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর বিশ্বকাপে আর ভালো পারফরম্যান্স নেই। এবার ঘরের মাঠে কোয়ার্টার ফাইনালে খেলে সবার হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন রুশরা। বেশি নজর কাড়ে স্পেনবধের পর। অথচ বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া দলগুলোর মধ্যে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে রাশিয়াই ছিল তলানিতে।

তবে শেষ আট থেকেই বিদায় নিতে হলো ডেনিশ চেরিশেভদের। সেমিফাইনালের লক্ষ্য নিয়ে রবিবার মধ্যরাতে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে মাঠে নামে স্বাগতিকরা; যদিও ক্রোয়াটরাই ছিল ফেভারিট। ঘরের মাঠে রাশিয়াও ছাড় দেওয়ার পাত্র নয়। প্রথম কয়েক মিনিটে দুই দলই বারবার আক্রমণে ওঠার চেষ্টা চালায়। খেলার ৩১ মিনিটে ডেনিশ চেরিশেভের অসাধারণ গোলে ১-০তে এগিয়ে যায় রাশিয়া। গোল হজম করে ক্রোয়াটরা তখন কিছুটা আক্রমণাত্মক হয়ে পড়ে। ৪১ মিনিটে গোলের দেখাও পেয়ে যায়। মাথা ছুঁইয়ে বল জালে পাঠান ক্র্যামারিচ। দ্বিতীয়ার্ধে আর কেউই গোলের দেখা পায়নি। তাই শুরু হয় অতিরিক্ত সময়ের খেলা। ১০১ মিনিটেই কর্নার থেকে হেডে গোল করে ক্রোয়েশিয়াকে এগিয়ে নেন ভিদা। পরে অবশ্য বক্সের একেবারে বাইরে ফ্রি কিক পায় স্বাগতিকরা। আর সেখান থেকেই ১১৫ মিনিটের মাথায় ২-২ গোলে সমতায় ফিরিয়ে উল্লাসে মাতায় পুরো স্টেডিয়ামকে। স্পেনবধের স্বপ্ন নিয়ে টাইব্রেকারে যায় আকিনফিভরা। কিন্তু না স্বপ্নভঙ্গ, তাদের প্রথম শটই আটকে দেন ক্রোয়াট গোলরক্ষক সুবাসিচ। শেষ হাসি হাসতে আর বেশি সময় লাগেনি। পেনাল্টিতে ৪-৩ গোলে স্বাগতিকদের কাঁদিয়ে মাঠ ছাড়েন লুকা মদরিচরা। তাই এবার আর রুশদের রূপকথা তৈরি হলো না।

হার-জিতের ঊর্ধ্বে উঠে অবশ্য রেকর্ড বুকে নাম লেখিয়েছে ম্যাচটি। কারণ দুই দলই নকআউটের পরপর দুটি ম্যাচ টাইব্রেকারে শেষ করে, যা বিশ্বকাপ ইতিহাসে আগে কোনোদিনও হয়নি। অর্থাৎ পরপর দুটি টাইব্রেকার খেলা দল একে অপরের মুখোমুখি হয়নি কখনো। রাশিয়া শেষ ষোলোতে শক্তিশালী স্পেনকে টাইব্রেকারে ১-১ (৪-৩) গোলে হারিয়ে শেষ আটে ওঠে। আর ক্রোয়েশিয়া ১-১ (৩-২) গোলে হারায় ডেনমার্ককে। বিশ্বকাপের রেকর্ডে নাম লেখিয়েছেন ক্রোয়াট গোলকিপার ড্যানিয়েল সুবাসিচও। পরপর দুই ম্যাচে পেনাল্টি আটকানোর রেকর্ডটি তারই। এ ছাড়াও বিশ্বকাপে চারটি পেনাল্টি বাঁচিয়ে তিনি ছুঁয়ে ফেললেন আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক সের্গিও গোয়কোচিয়া এবং পশ্চিম জার্মানির হেরাল্ড শুমাখারকে। এ দুই প্রাক্তন গোলকিপার নিজেদের দেশের হয়ে বিশ্বকাপে চারটি করে পেনাল্টি বাঁচিয়েছিলেন।

এদিকে বুকের মধ্যে কষ্টের পাথরটা যতই ভর করুক, হেরেও উৎসব করেছে রুশরা। ম্যাচের পর তারা জড়ো হয় সেন্ট্রাল মস্কোতে, স্পেনকে বিদায় করে দেওয়ার পরও সেখানে জড়ো হয়ে আনন্দে মেতেছিল। আসলে রাশিয়া যে বিশ্বকাপের এতদূর যাবে, সেটি কেউ ভাবেইনি। অদম্য মানসিকতার কারণে দেশ ও দেশের বাইরের সমর্থকদের মনে জায়গা করে নিয়েছেন আকিনফিভরা। অবশ্য সেই অসাধ্য সাধন হয়েছে স্পেনের বিশ্বকাপজয়ী কোচ ভিসেন্তে দেল বস্কের কল্যাণেই। তিনিও যে এখন রাশিয়ার নায়ক।

রাশিয়ার ফুটবল দলকে ‘নায়কের দল’ বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন। তার মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, ‘তিনি (পুতিন) খেলা দেখেছেন এবং দলকে সমর্থন দিয়ে গেছেন। দারুণ খেলেই আমরা বিদায় নিয়েছি। ওরা এখনো আমাদের নায়ক। প্রত্যেক ফুটবলারই জীবন দিয়ে খেলেছেন। আমরা তাদের নিয়ে গর্বিত।’ রাশিয়ার বিরোধী দলের নেতা অ্যালেক্সি নাভালানিও দলের পারফরম্যান্সে গর্বিত। তিনি বলেন, ‘এমন দলকে নিয়ে পুরো দেশ গর্ব করতে পারে।’

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here