ফুটবল বিশ্বকাপ শুরুর আগে কাল মার্ক্সের দেশ রাশিয়াকে নিয়ে বিতর্কের শেষ ছিল না। ভিনদেশি ফুটবলপ্রেমীদের জন্য নাকি দেশটি মোটেও নিরাপদ নয় বলেও কথা ছড়ায়। সবাই জানতো, রুশ সুন্দরীরা আসলে ছলনাময়ী। এখন বিশ্ববাসী বলছেন সব মিথ্যা। উল্টো এই অপার সৌন্দর্যের মধ্যে রয়েছে এক অসামান্য স্নিগ্ধতা আর আবেশ। আসরকে ঘিরে বরণ করে নেওয়া হয় প্রায় ১০ লক্ষাধিক ফুটবলপ্রেমী বিদেশি অতিথিকে। শহরের রাস্তায় রাস্তায় রঙ-বেরঙের সাজ। মস্কো থেকে সেন্ট পিটার্সবার্গ, সোচি সবই মন জয় করে নিয়েছে বিদেশিদের।

বৈচিত্র্যময় প্রকৃতির রূপের আধার, বৈকাল হ্রদ, ব্যালে আর সাইবেরিয়ার তুষারমাখা বিশাল দেশটি যেন আরেকটি পৃথিবী! কল্পনার জগতে হারিয়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। রাশিয়ার প্রেমে মুগ্ধ হয়ে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো তো বলেই ফেললেন, ‘আমরা সবাই রাশিয়ার প্রেমে পড়ে গেছি। যারাই এখানে একবারের জন্য এসেছেন, তারাই যেন দেশটিকে নতুন করে আবিষ্কার করেছেন।’

পশ্চিমাদের দীর্ঘ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় রাশিয়ার অর্থনীতি যখন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছিল তখন আশীর্বাদ হিসেবে আবির্ভূত হয় বিশ্বকাপ ফুটবল। মূলত রাশিয়ার ক্রিমিয়া খলকে কেন্দ্র করে তারে ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, যা এখনো অব্যাহত। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগেও সমালোচিত হয় রাশিয়া। পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের সঙ্গেও চলছে রাজনৈতিক টানাপড়েন। আর তাতেই পুতিনের দেশের অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই চলমান বিশ্বকাপকে দেশটির অর্থনীতির জন্য প্রণোদনা হিসেবেই দেখছেন অর্থনীতিবিদরা।

বিশ্লেষকরা জানান, বিশ্বকাপ উপলক্ষে জমে উঠেছে রাশিয়ার পর্যটন। এটি থাকবে দীর্ঘদিন। সেই সঙ্গে অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি সঞ্চার হবে, যা দেশটির ভগ্ন অর্থনীতিতে নতুন করে গতি সঞ্চার করবে। এ প্রসঙ্গে রাশান ফেডারেশন এজেন্সি অব ট্যুরিজমের প্রধান ওলেগ সাফোনভ বলেন, ‘বিশ্বকাপ ঘিরে যারা এ দেশে এসেছেন, ভবিষ্যতেও তাদের আকৃষ্ট করবে রাশিয়া। তাই দেশের অর্থনীতিতে এ শিল্প দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকা রাখতে পারে।’

আর সে লক্ষ্যেই পুরো রাশিয়া জুড়ে ছিল এলাহিকাণ্ড। এক জায়গায় ড্যান্সপার্টি তো অন্যস্থানে সেক্স ডল দিয়ে সাজানো নিষিদ্ধপল্লী। আছে চকলেট বার, ইলেক্ট্রনিক্সের দোকান। প্রতিটি স্টোর, রেস্তোরাঁ খেলার টিম বুঝে সাজানো হয়। রেড স্কয়ার থেকে ক্রেমলিন জাদুঘর। শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো মুখরিত ছিল বিদেশি পর্যটকদের পদচারণায়। মস্কোর বিপণিবিতান, ফুটকোর্টগুলোও জমজমাট। বিপুলসংখ্যক লোকের চাপ সামলাতে নতুন করে সাজাতে হয়েছে ফুটকোর্টগুলোর কর্মঘণ্টা, নিয়োগ দিতে হয়েছে অতিরিক্ত কর্মী। আর ড্যান্সপার্টির মূল আকর্ষণ রাশিয়ান সুন্দরী। দেশটির লোকজন আবার ইংলিশ বুঝে না, তাই যারা দক্ষ সেই সুরীদের চাকরি দেওয়া হয় বারগুলোতে। রাত নামার সঙ্গে সঙ্গেই হাইবিটে বেজে উঠে গান। তার মাঝে ছিল রঙিন আলোর ঝলকানি। সঙ্গে ওয়াইন, মদের রমরমা বিকিকিনি। চাইলে সাময়িক সময়ের জন্য মিলে সঙ্গীনিও। কেউ কেউ তাদের নিয়ে মেতে উঠেন আলো-আঁধারির খেলায়। পকেট ঝারলে হোটেল কক্ষেও সময় দিত তারা। এদিকে পুতলের সঙ্গে সময় কাটাতেও ছিল বিদেশিদের প্রচণ্ড ভীড়। দেখতে হুবহু নারীর মতো এমন ডল দিয়ে সাজানো হয় বিশেষ হোটেল। আসলে ঝামেলাহীন পুরুষদের কাছেই এগুলো প্রিয়। তারাই যৌন সম্পর্ক স্থাপন করতে সেখানে ছুটে যান। মূলত স্প্যানিসরাই ছিলেন এখানকার খদ্দের।

বিশ্বকাপ দেখতে যাওয়া লক্ষাধিক মুসলিম ভক্ত-সমর্থককেও হতাশ করেনি রাশিয়া। তাদের জন্য প্রকাশ করা হয় আলাদা একটি ট্রাভেল গাইড। যেখানে রাশিয়ায় থাকা মসজিদ, হালাল রেস্টুরেন্ট, নামাজের স্থান ও সময়সূচি ছিল। পবিত্র রমজানের সময়সূচিও ছিল সেই ট্রাভেল গাইডে। কারণ রোজার মধ্যেই এবারের আসর শুরু হয়। বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া ৩২টি দেশের মধ্যে সাতটিই ছিল মুসলিম প্রধান।

এদিকে খেলা দেখার পাশাপাশি দেশটির বিভিন্ন শহর ঘুরে বেড়ান বিদেশি পর্যটকরা। সেই সঙ্গে চলে বিপুল পরিমাণ কেনাকাটাও। তাদের আকর্ষণের কেন্দ্র রাশিয়ার ঐতিহাসিক স্থাপনা, নদী কিংবা সমুদ্র সৈকতে। ভলগা নদীর তীর ঘেঁষে রাশিয়ার অন্যতম বাণিজ্যিক শহর সারানস্ক। মস্কোর পশ্চিমে অবস্থিত শহরটিতেও ছিল বিশ্বকাপ আয়োজন। অথচ সারানস্ক অনেকটাই অচেনা। মারদোভা অ্যারেনা স্টেডিয়ামকে ঘিরে এখানকার পর্যটন শিল্পে বইছে সুবাতাস। বিশ্বকাপের আসর বসার পর বদলে গেছে শহরের পুরো চিত্র। অন্যান্য শহরের তুলনায় আয়তনে ছোট সারানস্কের নান্দনিকতায় মুগ্ধ পর্যটকরা। বিশ্ব আসর উপলক্ষে পর্যটক সমাগম বেড়েছে রাশিয়ার সচি শহরেও। ফুটবলের নান্দনিকতা দেখার পাশাপাশি এখানকার ঐতিহাসিক স্থাপনা ও সংস্কৃতিও আকৃষ্ট করছে পর্যটকদের। অবসর যাপনের জন্য তারা বেছে নিচ্ছেন সচির সমুদ্র তীরবর্তী রিসোর্টগুলোকে। এখানেই সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতান্ত্রিক নেতা জোসেফ স্ট্যালিনের ‘দ্য সামার হাউজ’। গ্রীষ্ম ও শরৎকালে স্ট্যালিন ও তার পরিবার এই বাড়িতে সময় কাটাতেন। বিশ্বকাপ উপলক্ষে রাশিয়া ভ্রমণে থাকা বিদেশিদের আগ্রহের কেন্দ্রে ৮১ বছর আগে নির্মিত ভবনটিও। এর অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক নকশায় মুগ্ধ পর্যটকরা। ঐতিহাসিক স্থাপনাটি দেখতে প্রতিদিনই রাশিয়ার সাগর তীরবর্তী শহর সচিতে ভ্রমণ করেন হাজারো বিদেশি। স্ট্যালিনের লেখার ডেস্ক, বিছানা, পোশাক, আঁকা ছবি রয়েছে বাড়িটিতে। সেই সঙ্গে রয়েছে একটি সুইমিংপুলও।

ফ্রান্স ও ক্রোয়েশিয়ার ফাইনাল ম্যাচ দিয়ে পর্দা নামে রাশিয়া ফুটবল বিশ্বকাপের। তার আগে থেকেই মস্কোর রেড স্কয়ারে চালু হয়েছিল তথ্য কেন্দ্র। কেবল তথ্যকেন্দ্র বললে ভুল হবে, এগুলোতে বিদেশি পর্যটক ও ফুটবল ভক্তদের হাসিমুখে বরণ করে নেওয়ার পাশাপাশি আশ্বস্ত করা হয়। রাশিয়ায় আপনারা নিরাপদে আছেন। সেখানকারই স্বেচ্ছাসেবক ক্রিশ্চিনা।

তিনি জানান, রাশিয়া নিয়ে মানুষের মধ্যে বিভিন্ন মিথ রয়েছে, এ বিশ্বকাপে সেটা ভেঙেছে। আসলে রাশিয়া সবার জন্যই উন্মুক্ত। সবাই উৎসব করেছে নিজের মতো। এখানকার মানুষ ও সংস্কৃতির সঙ্গে বিশ্ববাসীর একটা আন্তঃসংযোগ হয়েছে। রাশিয়াকে তুলে ধরাই ছিল আসরের মূল লক্ষ্য। কারণ এ দেশ নিয়ে সবার মধ্যে যে ধারণা, সেটা সত্য নয়। রাশিয়ার প্রশংসা করেছেন পর্যটকরাও। আলবার্তো পায়েস নামে এক আর্জেন্টাইন বলেন, ‘মস্কো অনেক বড় শহর, সুন্দর শহর। এখানকার নারী, মদ, ভাস্কর্য সবই দারুণ। ফিফা ও রাশিয়া দারুণ একটি আসর করলো।’

রাশিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়নমন্ত্রী মেক্সিম ওরেশকিন বলেন, ‘আমাদের হিসাব অনুযায়ী রাশিয়ায় বিশ্বকাপকে ঘিরে বিদেশিরা ১০০ বিলিয়ন রুবল (১.৬ বিলিয়ন ডলার) ব্যয় করবে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা আমাদের কোনো ক্ষতিই করতে পারবে না।’

বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইউরোমনিটর মনে করে, বিশ্বকাপকে ঘিরে রাশিয়ায় পর্যটকের যে স্রোত শুরু হয়েছে, তা অব্যাহত থাকবে। ২০২২ সাল পর্যন্ত রাশিয়ায় পর্যটক আগমনে প্রবৃদ্ধি থাকবে ৪ শতাংশ করে।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here