প্রথমবারের মতো ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছলেও ট্রফিটা স্পর্শ করতে পারেনি ক্রোয়েশিয়া। রানার্স হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে। তবে হেরে যাওয়ার ছাই থেকেও যে ফিনিক্সের উত্থান সম্ভব, ছোট ছোট দেশগুলোকে সে স্বপ্নই দেখিয়ে গেলেন লুকা মদ্রিচরা। যেন জানিয়ে দিলেন, পরাজয় আর পরাভূত হওয়া এক জিনিস নয়। বরং ধ্বংসস্তূপ থেকেই বেরিয়ে আসে নতুন স্বপ্ন। হয়তো সেভাবেই ফিরে আসবে ক্রোয়েটরা, কিংবা অন্যকোনো দেশ। কষ্টচোখের জলই হয়তো একদিন আনন্দাশ্রু হয়ে লেগে থাকবে সোনালি ট্রফির গায়ে। পরাজয়ই শেষ কথা নয়। আসলে স্বপ্ন দেখতে জানলে জীবনের কাঁটাগুলোও গোলাপ হয়ে ধরা দেয়।

রাশিয়া মিশনের শুরুর দিকে কে-ই বা ভেবেছিল, বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলবে ক্রোয়েশিয়া। সবচেয়ে বড় কথা দলটির রাশিয়াতে থাকারই কথা ছিল না। প্লে-অফ খেলে অবশেষে টিকিট নিশ্চিত করে। সেই দলকে ট্রফির দাবিদার ভাবা তো দূরের কথা, গ্রুপ পর্ব টপকাতে পারবে বলেও বিশ্বাস ছিল না। কারও মনের ভাবনা নিয়ে আর যাই হোক ফুটবল যে চলে না, তা দেখিয়ে দিয়েছে ক্রোয়েটরা। একে একে বড় দলগুলোকে হটিয়ে ফুটবল বিশ্বে এক নতুন দেশের স্বপ্ন দেখাচ্ছিলেন মদ্রিচ, রাকিতিচরা। মেসির আর্জেন্টিনাকে যেদিন মাটিতে শুইয়ে দেওয়া হয়, সেদিনই ক্রোয়েশিয়ার জাত চিনেছে সবাই।

পুরো আসরে ক্রোয়েশিয়ার পারফরম্যান্স অংখ্য ফুটবলপ্রেমীর হৃদয় জিতে নিয়েছে। সেই সঙ্গে দেশটির প্রেসিডেন্ট কোলিন্দা গ্র্যাবার কিত্রারোভিচও। ফুটবলের প্রতি তার ভালোবাসা এবং প্রতিনিয়ত দলের খেলোয়াড়দের অনুপ্রেরণা জোগানো বিশ্ববাসীর মন কেড়েছে। প্রেসিডেন্ট হয়েও ক্রোট সমর্থকদের সঙ্গে বিমানের ইকোনমি ক্লসেই রাশিয়ায় খেলা দেখেতে আসেন তিনি। দলকে উৎসাহ দিতে জার্সি পরেই ছিলেন মাঠে। ফাইনালেও এর ব্যতিক্রম ছিল না।

ফুটবল আকাশে ক্রোয়েশিয়ার উদয় যেন ধুমকেতুর ন্যায়। তাদের হঠাৎ এই উত্থানে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন অনেক ফুটবলবোদ্ধা। ১৯৯১ সালে পূর্ব ইউরোপে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে নতুন করে স্বাধীনতা পাওয়া ক্রোয়েশিয়াকে ১৯৯৮ বিশ্বকাপের আগে বাংলাদেশের মানুষ চিনতো না বললেই চলে। প্রথমবার এসেই সেমিফাইনাল খেলেছিল পূর্ব ইউরোপের দেশটি। ডেভর সুকার জিতেছিলেন গোল্ডেন বুট।

রাশিয়া বিশ্বকাপের ফাইনালে ফিফা প্রেসিডেন্ট ইনফ্যান্তিনোর পাশেই বসে আয়োজক দেশ রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন। তাদের দুপাশে দুই প্রতিযোগী দেশের প্রেসিডেন্ট। এদিন কোলিন্দা গ্র্যাবার পাশাপাশি নজর কাড়েন বিশ্বকাপজয়ী ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রনও। জয়ের পরই রাষ্ট্রপ্রধানের প্রটোকল দূরে ঠেলে উল্লাসে ফেটে পড়েন। তার পর ঘটালেন এক দারুণ কাণ্ড। বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দে তার স্ত্রী যখন নাচছেন, তখনই ম্যাক্রনকে অভিনন্দন জানাতে এগিয়ে আসেন ক্রোয়েশিয়ার প্রেসিডেন্ট। দুজনে বেশ অন্তরঙ্গভাবেই পরস্পরকে চুম্বন করলেন। পাশ্চাত্যে এটা নিতান্তই সাধারণ ব্যাপার, কিন্তু দুই রাষ্ট্রপধানের চুম্বনে যে আনুষ্ঠানিকতা থাকে, এদিন সেটার বিন্দুমাত্রও ছিল না। বরং ছিল স্বতঃস্ফূর্ততা। পাশে দাঁড়িয়ে সেটা উপভোগ করলেন ফিফা প্রেসিডেন্ট।

এবার মাঠে সবাই। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। আকাশ ফেটে বৃষ্টি ঝরছে। একদিকে বাঁধভাঙা আনন্দ, অন্যদিকে বৃষ্টির মিষ্টি জলে চোখের লোনতা জল মিশে একাকার। আসরের সেরা ফুটবলার ঘোষণা করা হলো ক্রোয়েশিয়ার অধিনায়ক লুকা মদ্রিচকে। তার হাতে সোনার বল তুলে দেওয়া হলো। বল নিয়ে ধীর পায়ে তিনি এগিয়ে গেলেন ক্রোট প্রেসিডেন্টের দিকে। দুজনের চোখ দিয়েই তখন জল গড়াচ্ছিল। মদ্রিচকে মাথা ও গাল ছোঁয়ে আদর করে দিলেন কোলিন্দা গ্র্যাবা। পরক্ষণেই বুকে টেনে নিয়ে কিছু একটা বলছিলেন অধিনায়ককে।

হয়তো বলেছিলেন- তোমরা স্বপ্ন দেখতে শেখালে গোটা ফুটবলবিশ্বকে। বুঝিয়ে দিলে, ছোট-বড় আসল কথা নয়, হিসাব বদলে দিতে হয় সংগ্রামের ইতিবৃত্তে। আমরা হতে পারি মাত্র ৪২ লাখ লোকের দেশের বাসিন্দা, কিন্তু একশো কোটির দেশকেও গোল দিতে পারি। এরপর থেকে ক্রোটদের আর কেউ হিসাবের বাইরে রাখবে না নিশ্চয়ই।

বৃষ্টিতে ভিজে পুরো অনুষ্ঠানেই নিজ দলের ফুটবলারদের বুকে জড়িয়ে গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে নিজের ভালোবাসা এবং স্নেহ উজাড় করে দিয়েছেন কোলিন্দা গ্র্যাবা। শুধু ক্রোয়েশিয়ার ফুটবলারদেরই নয়, বিজয়ী দল ফ্রান্সের ফুটবলারদেরও একইভাবে নিজের ভালোবাসা উজাড় করে দেন। আর এই ভালোবাসার নামই ফুটবল।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here