‘তোমাদের কী শিক্ষা হলো?’ এক বালক বলল, ‘প্রতীজ্ঞা করছি, আমি একজন ভালো মানুষ হব। সুনাগরিক হব।’
‘এখন তোমাদের স্বপ্ন কী?’ ‘ফুটবলার হব,’ বলল কেউ কেউ, ‘থাইল্যান্ডের হয়ে খেলতে চাই।’ আর পাঁচ বালক বলল, ‘নেভি সিল হব।’

বুধবার থাইল্যান্ডের চিয়াং রাই শহরে এভাবেই সাংবাদিকদের নির্বাচিত প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিল ১২ খুদে ফুটবলার। সঙ্গে ছিলেন তাদের সহকারী কোচ একাপল চ্যান্তাওং আকে। হাসপাতাল ছেড়ে পরিবারের কাছে ফেরার আগে তারা এ সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেয়। উদ্ধার হওয়ার ছয় দিন পর তারা এভাবে প্রকাশ্যে আসার সুযোগ পেল।

২৩ জুন থাম লুয়াং গুহায় বেড়াতে গিয়ে আটকা পড়ে ‘মু পা’ (বুনো শূকর) নামের ফুটবল লটি। নয়নি নিখোঁজ থাকার পর ২ জুলাই ১২ স্কুলবালক ও তাদের কোচের জীবিত সন্ধান পান ব্রিটিশ দুই ডুবুরি। তারা আটকা পড়েছিল গুহামুখ থেকে চার কিলোমিটার ভেতরে মাটির আটশ মিটার নিচে। ৮-১০ জুলাই তিনদিনের শ্বাসরুদ্ধকর ও ভয়ঙ্কর ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে গুহা থেকে সবাইকে জীবিত উদ্ধার হয়। এ অভিযানে থাইল্যান্ডকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিল চীন, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশ। সবমিলিয়ে হাজারের বেশি দক্ষ ও প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মী এ অভিযানে অংশ নেন। গুহায় অক্সিজেনের অভাবে ৬ জুলাই মারা যান গুনন। কিন্তু উদ্ধার হওয়া কিশোরদের সে খবর দেওয়া হয় দুদিন বাদে। ডাক্তাররা তাদের মানসিক শক্তির কথা বিবেচনায় রেখে সে খবর চেপে রেখেছিলেন।

উদ্ধারের পর তাদের চিয়াং রাই শহরের প্রচানুকরো হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এদের কয়েকজন নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিল। দ্রুত সুস্থ হওয়ায় বুধবার তাদের বাড়ি পাঠানো হবে বলে মঙ্গলবার জানিয়েছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী পিয়াসকল সকলসতায়াদর্ন।

ওদের শিক্ষা ও স্বপ্ন
কিশোররা যেন আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে, গণমাধ্যম যেন বারবার বাড়ি কিংবা স্কুলে-মাঠে, পথে-ঘাটে ওদের প্রশ্ন করে বিব্রত বা বিরক্ত না করে এসব মাথায় রেখে থাই কর্তৃপক্ষ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। সাংবাদিকদের কাছ থেকে চেয়ে নেওয়া হয় প্রশ্ন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও মনোবিদরা সেসব প্রশ্ন খুঁতিয়ে দেখেন। যেসব প্রশ্ন ওই কিশোরদের ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না, সেসবই কেবল পড়ে শোনানো হয়। কোচ আকে ও তার দল স্বতস্ফূর্তভাবে সেসবের উত্তর করে।

সমন্বিত ইচ্ছা
গুহায় বেড়াতে যাওয়ার ব্যাপারে কিশোররা জানিয়েছে যে, তারা সবাই মিলেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। একজন বলেছে, সে বাড়িতে না জানিয়ে গুহায় গেছিল। আরেকজন বলেছে, বাড়িতে সে গুহাতে বেড়ানোর কথা বলেছিল, কিন্তু থাম লুয়াং গুহার কথা না বলে অন্য একটি গুহার কথা বলেছিল। কোচ আকে এরপরও সব অভিভাবকের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। যদিও আগেই সব অভিভাবক তাকে ‘নির্দোষ’ বলেছেন। এদিকে একজন কিশোর তার ভয়ের কথা জানিয়েছে, ‘বাড়ি গেলে বাবা বোধ হয় আমাকে পিটাবেন।’

বিকল্প প্রচেষ্টা
গুহার ভেতর যাওয়ার পর বৃষ্টি বাড়তে থাকে। গুহা প্লাবিত হয়। কিন্তু আকে ভেবেছিলেন, হয়ত বৃষ্টি কমে যাবে। একদিন পরই তারা বেরিয়ে আসতে পারবেন। অবশ্য তা হয়নি। টানা বৃষ্টির কারণে তারা আটকা পড়েন। তবে কেউ হতাশ হয়নি। আকে সবাইকে মনবল স্থির আর ধৈর্য ধরতে বলেন। কিশোররা জানিয়েছে, তারা সাহস নিয়ে ছিল। পাশাপাশি গুহা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার বিকল্প পথও খুঁজছিল।

অলৌকিক মুহূর্ত
কিশোররা বলেছে, যখন ব্রিটিশ দুই ডুবুরি গুহার গহীন অন্ধকারে তাদের কাছে পৌঁছে যান, তখন তারা আশা ফিরে পেয়েছিল। ওই মুহূর্তকে তারা ‘অলৌকিক’ বলে অভিহিত করেছে। উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়া সবাইকে তারা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছে। ইংরেজি জানা কিশোর আদুল স্যাম-অন ডুবুরিদের সঙ্গে কথা বলেছিল। কোচ তাকে বলেছিল, যার যার কথা সে যেন ইংরেজিতে ওই ডুবুরিদের জানায়। ওইদিন তারা খাবারের কথা বলেছিল। আর জানতে চেয়েছিল, কবে তাদের উদ্ধার করা হবে।

গুননের প্রতি শ্রদ্ধা
তাদের উদ্ধারে গিয়ে প্রাণ দেওয়া নেভি সিল সমন গুননের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে কিশোররা। কোচ আবে তার পরিবারের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তারা গুননকে ‘গুহার রাজা’ আখ্যা দিয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে তারা নিজেদের আঁকা গুননের একটা ছবি দেখান। ছবিটা বাঁধাই করে গুননের পরিবারের কাছে দেওয়ার কথা।

গুহার ভেতর আহার
গুহায় আটকা পড়ার পর তারা শুধু জল খেয়ে বেঁচে ছিল। আকে বলেছেন, গুহার গায়ে গর্তে থাকা জল সংগ্রহ করে কিশোরদের খাইয়েছেন তিনি। জল ভিন্ন আর কিছুই তারা পাননি।

সবাই সাঁতার জানে
আগে খবরে বেরিয়েছিল, তারা কেউ সাঁতার জানে না। কিন্তু সংবাদ সম্মেলনে কিশোররা জানিয়েছে, তারা সবাই সাঁতার জানে। আকে বলেছেন, প্রায়ই খেলার পর তারা সাঁতারে যেত। কিন্তু গুহার অনেক ভেতরে আটকা পড়ার পর সংকীর্ণ ওই প্রকোষ্ঠের ভয়ঙ্কর পথে তারা সাঁতার কাটার সাহস পায়নি।

কেউ কারো আগে নয়
যখন চূড়ান্ত অভিযান শুরু হলো, কোনো কিশোরই দাবি করেনি যে, তাকে প্রথমে উদ্ধার করতে হবে। কোচ আকে মজা করে বলেন, গুহা থেকে যার বাড়ি দূরে তাকে আগে উদ্ধার করা হয়েছে। অভিযানের শেষ দিন কোচ ও দলটির সর্বকনিষ্ঠ সদস্যকে বের করে আনা হয়।

আবার গুহা
আর কি কোনোদিন ওই গুহায় বেড়াতে যাবেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে আকে বলেছেন, অবশ্যই। তবে গাইড নিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন তিনি। আর বেশিরভাগ কিশোরই বলেছে, তারা আর অমন বিপদে পড়তে চায় না।

বিশ্বকাপ ফাইনাল
কিশোররা উদ্ধার হওয়ার পর রাশিয়ায় বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচ হয়েছে। কিশোররা জানিয়েছে, হাসপাতালে বসে তারা খেলা দেখেছে। তারা ফ্রান্সকে সমর্থন করেছে। ফিফা তাদের ফাইনাল ম্যাচ দেখার আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। কিন্তু তারা যেতে পারেনি।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here