পবিত্র ঈদুল আজহা আজ। ত্যাগের মহিমা ও আনন্দের বার্তা নিয়ে মুসলিম বিশ্বের ঘরে ঘরে ঈদুল আজহা হাজির হয় ১০ জিলহজে। ভোগে নয়, ত্যাগেই আনন্দ। ত্যাগের আনন্দ অনুভব ও ত্যাগের অনুশীলনের জন্য সমগ্র জাতির প্রস্তুতি এখন সম্পন্ন প্রায়। “ওরে হত্যা নয় আজ সত্যাগ্রহ শক্তির উদ্বোধন”।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের এই বিখ্যাত কাব্য পংক্তির মধ্যে চমৎকার ভাবে ফুটে উঠেছে ঈদুল আজহার মর্মবাণী। কোরবানির ঈদে পশু কোরবানি নিছক প্রাণী হত্যা নয়; বরং এটা ত্যাগের শক্তিতে ও নববলে বলীয়ান হওয়ার এক মহাসুযোগ।

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ঘোষণা করেছেন, কোরবানির পশুর রক্ত কিংবা গোশত তার কাছে পৌঁছে না, পৌঁছে কোরবানিদাতার পরহেজগারি ও সদিচ্ছা-মহান রবের প্রতি বান্দাহর আনুগত্য। যে পবিত্র ঘটনাকে স্মরণ করে প্রতিবছর ঈদুল আজহা উদযাপিত হয়, এর সূত্রপাত আজ থেকে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ বছর আগে।

ঘটনাটি হচ্ছে মুসলিম জাতির পিতা আল্লাহর নবী হযরত ইব্রাহীম (আ.) আল্লাহপাকের নির্দেশে স্বীয় পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.) কে কোরবানি করতে উদ্যত হয়েছিলেন। আল্লাহর ভালোবাসায় সর্বাপেক্ষা প্রিয় বস্তু উৎসর্গ করতে পারেন কিনা তা পরীক্ষা করার জন্যই আল্লাহতায়ালা ইব্রাহিম (আ:) কে এই নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। অবশ্য, এখন আর সেইরূপ সর্বাপেক্ষা প্রিয় বস্তু কোরবানি করতে হয় না। বরং হালাল পশু জবাই দ্বারাই কোরবানি আদায় হয়ে যায়।

ঈদুল আজহায় কোরবানি করা সমস্ত নেক কাজের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম। কোরবানির পশুর রক্ত মাটি স্পর্শ করার আগেই তা আল্লাহর নিকট কবুল হয়ে যায়। প্রত্যেক সামর্থ্যবান লোকের ওপর কোরবানি ওয়াজিব। যাকাত পরিমাণ মাল থাকলে কোরবানি দিতে হবে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি করে না, সে যেন আমার মুসাল্লায় (ঈদের জামাতে) না আসে।

ঈদুল আজহা সমাজের বিত্তবান মানুষের মতো দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জীবনেও নিয়ে আসুক নির্মল আনন্দ। পবিত্র ঈদুল আজহার ত্যাগ, ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার শিক্ষা ও চেতনা সহায়ক হোক বিদ্যমান সংকট উত্তরণে। ঈদের প্রাক্কালে এটাই আন্তরিক কামনা। ঈদুল আজহা সবার জীবনে বয়ে আনুক অফুরান আনন্দের সুবাতাস।

মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসবের এ দিনটি ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর। কুরবানির মাধ্যমে সর্বোচ্চ ত্যাগের আদর্শ স্থাপন এবং ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভ। এই হলো ঈদুল আজহার প্রকৃত তাৎপর্য। ত্যাগ, ধৈর্য ও সহনশীলতার মনোভাব নিয়ে শান্তি ও ন্যায় নীতিভিত্তিক এক মানবিক বিশ্ব গড়ে তোলার ঐকান্তিক আকাক্সক্ষায় উজ্জ্বীবিত এই দিন।

হযরত ইব্রাহিম (আ.) ইসলাম ধর্মের একজন গুরুত্বপূর্ণ নবী, যিনি ছিলেন আল্লাহর একজন প্রিয় নবীও। স্বপ্নাদিষ্ট হন প্রিয়তম বস্তু কুরবানি করার জন্য। সেই অনুযায়ী তিনি পরম করুণাময় আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য প্রিয়পুত্র ইসমাইলকে কুরবানি দিতে সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু মহান সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায় তাঁকে আর শেষ পর্যন্ত পুত্রকে কুরবানি দিতে হয়নি। প্রিয় পুত্রকে কুরবানি দেয়ার প্রাক্কালে ইসমাইলের পরিবর্তে কুরবানি হয় একটি পশু।

খোদাভক্তি, আনুগত্য ও ত্যাগের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন হযরত ইব্রাহিম (আ.)। এই সর্বোচ্চ ত্যাগের মহিমাকে তুলে ধরাই ঈদুল আজহার পশু কুরবানির প্রধান মর্মবস্তু। এর সুমহান তাৎপর্যকে যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারলে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে, কুরবানিকে কেন্দ্র করে পার্থিব ধন-দৌলত জাহির করার কোনো সুযোগ নেই।

বাস্তবে আমরা এর উল্টো চিত্রই দেখতে পাই। কে কত বেশি দামের বা কত বেশি সংখ্যক পশু কুরবানি দিচ্ছেন, সেটাই অনেকের কাছে মুখ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। এ যেনো সামর্থ্য দেখানোর প্রতিযোগিতা। অর্থবানের বাহাদুরির প্রদর্শনী। অথচ কুরবানির আসল তাৎপর্য বাহ্যিক আড়ম্বর প্রদর্শনীতে নয়। বরং আত্মত্যাগের সাধনায়। তাই, শান-শওকাত, বিত্ত-বৈভবের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ প্রদর্শনী কুরবানির ঈদের চেতনার সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ। ঈদুল আজহা বা কুরবানির পালনের এর প্রকৃত চেতনা ও মর্মবাণীরই প্রতিফলন ঘটুক, এটাই ধর্মীয়ভাবে প্রত্যাশিত।

ঈদ মানেই আনন্দ। ঈদের জামাতে ধনী-নির্ধন নির্বিশেষে সব মুসলমান এক কাতারে সমবেত হন। এতে সাম্য ও ভ্রাতৃত্ববোধের চমৎকার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। তবে, সমাজের সর্বস্তরে এই সাম্য প্রতিষ্ঠা এখনো হয়নি। ধনী দরিদ্রের ব্যবধান বিশ্বের নানা স্থানের মতো বাংলাদেশেও ব্যাপক। জনসংখ্যার অধিকাংশ শোষণ বঞ্চনার শিকার, মানবেতর জীবনযাপনই যেন তাদের নিয়তি।

এই বৈষম্যের ভারে জর্জরিত সমাজের সব মানুষের মুখে হাসি ফোটানো, তাদের আনন্দের অংশীদার করে নেয়ার মধ্যেই ঈদের আনন্দ ও সম্পূর্ণতা সার্থকতা পায়। এটা সত্যি যে, বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারলে, ধনী গরিবের ব্যবধান ঘোচাতে না পারলে এবং সবার জন্য উন্নত জীবনযাপনের সুযোগ অবারিত না করতে পারলে সমাজে প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠিত হওয়া সম্ভব নয়।

সুতরাং কাক্সিক্ষত বৈষম্যহীন সমাজ গড়তে আমাদের ত্যাগ, সহমর্মিতা, ভালোবাসার আদর্শে অনুপ্রাণিত হতে হবে। বিত্তহীনদের সাহায্যে এগিয়ে আসতে হবে বিত্তবানদের। ঈদুল আজহা মানুষকে সেই মহৎ আদর্শের দিকেই আহবান করে।

আজকের এদিনে আমরা বিশ্বের সকল দেশের সব হজব্রত পালনকারীর নিরাপত্তা ও সুস্বাস্থ্য কামনা করছি। প্রত্যাশা করছি, হজব্রত পালনকারী সবাই নিরাপদে স্ব স্ব দেশে ফিরে আসুন। আমাদের ঐকান্তিক প্রত্যাশা, ঈদুল আজহার মহান ত্যাগের মহিমায় দেশ ও বিশ্বের সব মানুষ উজ্জীবিত হয়ে উঠবেন।

ঈদুল আজহা বয়ে আনুক অপার আনন্দ, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের বার্তা। ঈদের আনন্দকে উপলক্ষ করে কণ্টকমুক্ত হোক আমাদের সবার আগামী দিনের পথ চলা। সবাইকে ঈদ মোবারক।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here