প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমার বাবার বিশ্ববিদ্যালয়, আমারও বিশ্ববিদ্যালয়।  আমি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে ভর্তি হওয়ার কিছুদিন পর বিদেশে গেলাম। তখনই পরিবারের হত্যাকাণ্ড ঘটলো। দেশে ফিরতে পারলাম না ছয় বছর। এর আগে মাকে বলেছিলাম, এখন খুব ভালোভাবে পড়াশোনা করে মাস্টার্স ডিগ্রি নেবো। সেটা তো আর হলো না। যদিও পরে আমাকে এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনারারি ডিগ্রি দেওয়া হয়। কিন্তু পড়াশোনা করে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি নেওয়ার ইচ্ছেটা অধরাই থেকে গেলো।

শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলে ৭ মার্চ ভবন উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এসময় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘৭ মার্চের সঙ্গে আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য জড়িত, ৭ মার্চের ভাষণ জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের দিকনির্দেশনা দিয়েছে এবং সেই ভাষণ আজ বিশ্ব ঐতিহ্যে স্থান পেয়েছে। বাংলাদেশ নামক একটি রাষ্ট্র গঠন করা এবং দেশকে উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই ছিল জাতির পিতার জীবনের লক্ষ্য। আজকে বাংলাদেশের যতটুকু অর্জন তা জাতির পিতার অবদান। স্বাধীনতার পর তিনি মাত্র সাড়ে তিন বছর ছিলেন। এই সময়ের মধ্যেই কীভাবে জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন সেসব পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। স্থল সীমান্ত চুক্তি থেকে সমুদ্রের সীমারেখা- সবকিছু নিয়েই পরিকল্পনা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। আজকে বাংলাদেশে যে উন্নয়ন হচ্ছে তার ভিত্তি রচনা করে গিয়েছেন তিনি।’

তিনি বলেন, জাতির পিতার সময়ে যত আন্দোলন হয়েছে সেটার সূতিকাগার হিসেবে আন্দোলন সংগ্রাম এগিয়ে নিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সব আন্দোলন সংগ্রাম এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই শুরু। বাংলা ভাষায় কথা বলা থেকে শুরু করে স্বাধীনতা সংগ্রামের সূত্রপাত এই বিশ্ববিদ্যালয়েই।

শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের পরামর্শ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন,শিক্ষার উন্নয়নের জন্য আমরা সাধ্য মতো চেষ্টা করে যাচ্ছি। শিক্ষা খাতে বাজেটে যে খরচ বরাদ্দ হয় সেটাকে আমরা ব্যয় বলি না, বলি বিনিয়োগ। যেটা দেশ গঠনে কাজে লাগবে। আমরা চাই শিক্ষক যেমন শিক্ষা দিবেন শিক্ষার্থীরাও যেন উপযুক্তভাবে শিক্ষা গ্রহণ করেন। প্রত্যেকেই শিক্ষার্থীকে নজর রাখতে হবে যেন এসব ভবনের পরিচ্ছন্নতা বজায় থাকে।

‘বাঙালিদের যেখানে সেখানে ময়লা ফেলার বদভ্যাস ত্যাগ করতে হবে। এছাড়া উশৃঙ্খলা কখনোই কাম্য নয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়ম কানুন মেনে চলতে হবে। আমাদের বয়স হয়ে গেছে। সময় শেষ। এরপরের প্রজন্ম যেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বড় হয়ে উঠে সেটা মাথায় রাখতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেক সময় দেশের বাইরে গেলে অনেক দেশের প্রধানমন্ত্রী বা সরকারপ্রধান আমাকে প্রশ্ন করে, তোমরা এত স্বল্প সময়ে এত অর্থনৈতিক উন্নয়ন করলে কীভাবে? অন্যান্য দেশের সরকার তো পারে না। তোমাদের ম্যাজিকটা কী? আমি বলি, আমরা একটা আদর্শ নিয়ে কাজ করি। কী করলে মানুষ ভালো থাকবে, তাদের উন্নতি হবে আমরা তা ভেবে কাজ করি। জাতির পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করি বলেই আজ দেশ এভাবে এগিয়ে যাচ্ছে।

দেশের উন্নয়নের প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘২০২০ সালে জাতির পিতার জন্মশতবাষির্কী ও ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করা হবে। রাস্তাঘাট, পুল, ব্রিজ, ফ্লাইওভার থেকে শুরু করে কর্ণফুলি নদীর টানেল পর্যন্ত আমরা নির্মাণ করছি। দেশে মানুষ বাড়ছে, মানুষের জীবনমান উন্নত হচ্ছে। প্রযুক্তির ব্যবহারে দেশের মানুষ যথেষ্ট অগ্রগামী। একটু শিক্ষা দিলেই তারা করে ফেলতে পারে। দেশের বাইরে গেলে বিভিন্ন সরকার প্রধানরা জানতে চান- ম্যাজিকটা কী? আমি শুধু একটা কথাই বলি- ক্ষমতা শুরু ভোগের বস্তু নয়, ক্ষমতা হলো দায়িত্বের। জনগণের জন্য দায়িত্ব পালন করলে দেশ এগিয়ে যায়। মানুষের কল্যাণ হয়।’

শিক্ষার গুরুত্বের প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘শিক্ষার ওপর আমরা সবথেকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকি। শিক্ষাকে বহুমুখীকরণ ও জনগোষ্ঠীর কর্মস্থানের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। বিশেষ করে উচ্চ শিক্ষা। আমরা শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট ফান্ড করেছি যার মাধ্যমে উচ্চ শিক্ষা পর্যায়েও বৃত্তির ব্যবস্থা করা হচ্ছে।’

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘প্রযুক্তি ব্যবহার করে আধুনিক জ্ঞানসম্পন্ন জাতি গড়ে তুলতে চাই। বিজ্ঞান পড়ার দিকে ছেলেমেয়েদের ঝোঁক বাড়ানোর জন্য ১২টি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় করার উদ্যোগ নিয়েছিলাম। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় নামটি ঠিক করা হয়েছে শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান শিক্ষায় আগ্রহী করে তোলার জন্য। এছাড়াও মেডিক্যাল কলেজসহ বিভিন্ন জেলায় আরও বিশ্ববিদ্যালয় করা হয়েছে। শিক্ষাকে বহুমুখী করা ও বহুমুখী গবেষণার জন্য সরকার প্রতিবারই আলাদা বরাদ্দ রাখছে।’

দেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করায় বিএনপি সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘১৯৯৬ সালে সরকার গঠনের পর বাংলাদেশের প্রত্যেকটা জেলাকে নিরক্ষরতামুক্ত জেলা হিসেবে গড়ার উদ্যোগ নিয়েছিলাম, প্রতি ছয় হাজার মানুষের জন্য একটি করে কমিউনিটি ক্লিনিক সেবার উদ্যোগ করেছিলাম, ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে বিএনপি এসব বন্ধ করে দেয়। সেসময় দেশে স্বাক্ষরতার হারও কমে যায়। যাই হোক, এখন আমরা আবার কাজ করছি।দেশে স্বাক্ষরতার হারও আবার বাড়ছে। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের ছেলেমেয়েদের উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।’

জাতির গঠনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘এই বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৫২ সালের মাতৃভাষার সংগ্রাম থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, সর্বক্ষেত্রেই অগ্রগণ্য ভূমিকা রেখেছে। সেকারণেই এই বিশ্ববিদ্যালয় আলাদা গুরুত্ব বহন করে। ছয় দফা আন্দোলন থেকে শুরু করে যত সংগ্রাম আন্দোলন হয়েছে, সব আন্দোলনের সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। স্বাধীনতার প্রতিটি আন্দোলনে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা অনেক।’

এক পর্যায়ে সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘একটা দুঃখ আছে মনে- আমার বাবাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তার পড়াশোনা শেষ করতে পারেনি, তিনি কর্মচারীদের অধিকার আন্দোলনে গিয়ে বহিষ্কৃত হন। আর ১৯৭৫ সালের ট্রাজেডির পর আমিও আমার লেখাপড়া শেষ করতে পারিনি। তবে আমাকে অনারারি ডিগ্রি (মাস্টার্স ডিগ্রি দেওয়ায়) আমি ধন্যবাদ জানাই।’ এছাড়া বঙ্গবন্ধুর বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করায় আরো একবার ধন্যবাদ দিয়েছেন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের আগে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মুহাম্মদ আখতারুজ্জামান, সহ-উপাচার্য ড. মুহাম্মদ সামাদ (প্রশাসন), সহ-উপাচার্য নাসরীন আহমাদ, ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদসহ আরো অনেকে।

এর আগে, আজ সকাল সাড়ে ১০টায় রোকেয়া হলে আসেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণকে স্মরণীয় করে রাখতে রোকেয়া হলের ছাত্রীদের জন্য নবনির্মিত ৭ মার্চ ভবন উদ্বোধন করেন। প্রধানমন্ত্রী আনুমানিক বেলা ২টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থান করবেন। এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর গৃহীত নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থার কারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বসাধারণ ও সংশ্নিষ্টদের বিকল্প রাস্তা ব্যবহারের জন্য পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

এদিকে, প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে সচিবালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল পর্যন্ত আলপনা আঁকবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মিলিত শিক্ষার্থী সংসদ।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here