সারের জন্য কৃষকদের এখন আর গুলি খেতে হয় না, যা বিএনপি সরকারের আমলে হয়েছে। শনিবার (৮ সেপ্টেম্বর) জাতীয় কৃষি কনভেনশন ও আন্তজার্তিক কৃষি কনফারেন্সের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে ভাষণকালে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।

বিএনপি সরকারের সময় সারের দাবিতে লাইনে দাঁড়িয়ে গুলি খেয়ে প্রাণ দিতে হয়েছিল ১৮ জন কৃষককে। সেই প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, এখন সারের জন্য কৃষকদের গুলি খেতে হয় না। সার কৃষকের হাতের মুঠোয় চলে আসে।

তিনি বলেন, ‘১০ টাকায় কৃষকদের জন্য ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে দিয়েছি। তাদের ভর্তুকির টাকা তাদের হাতে পৌঁছায়। সরকারে এসে তিন দফা সারের দাম কমিয়েছি। যাতে কৃষকরা উৎপাদন বাড়াতে পারেন।’

‘আগে বর্গাচাষীরা ঋণ পেত না। কিন্তু আমরা প্রথম এই প্রথম ঋণের ব্যবস্থা করে দিয়েছি।’

‘কৃষি ব্যাংকের তেমন শাখা ছিল না। হাটের দিন ব্যাংকের লোকজনের কাছে টাকা পৌঁছে যেত। সেখানে টাকা নিয়ে ব্যাংকের লোকজন কৃষকদের হাতে দিত এভাবেই আমরা তাদের ঋণের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম। জামানতহীন ঋণের ব্যবস্থাটা আওয়ামী লীগ সরকারই প্রথম করেছিল।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘জাতির পিতা সারাটা জীবন সংগ্রাম করেছেন বাংলার মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য। পেটে ক্ষুধা, শোষিত বঞ্চিত মানুষের ভাগ্য কীভাবে তিনি পরিবর্তন করবেন সেটিই ছিল তার চিন্তা। সে কারণে তিনি ২৩ বছর সংগ্রাম করেছেন। তারই ডাকে ৯ মাসের মধ্যে আমরা সংগ্রাম করে স্বাধীনতা পাই।’

‘স্বাধীনতার পর তিনি বাংলাদেশকে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের দিকে নিয়ে যান। জাতির পিতার এ কর্মসূচির কারণে বাংলাদেশ সাড়ে তিন বছরে যুদ্ধের ভয়াবহতা অতিক্রম করে এগিয়ে যায়। বঙ্গবন্ধু কৃষিখাতকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তিনি কৃষিবিদদের মর্যাদা প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত করেন’ বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘শূন্য থেকে ধীরে ধীরে যাত্রা ছিল বঙ্গবন্ধু। তিনি সবুজ বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন। যে কারণে আমাদের দেশ কৃষিক্ষেতে খুব দ্রুত এগিয়ে যায়। কিন্তু ৭৫ এ তাকে হত্যা করা হয়। হত্যার পর যারা ক্ষমতায় এসেছিল তাদের কাজ ছিল এদেশের মানুষকে নিপীড়ন করা। বাংলাদেশ এগিয়ে যাক তা তারা চায়নি।’

‘৭৫ এ যারা ক্ষমতায় এসেছিল তাদের লক্ষ্য ছিল ব্যবসা করা। তারা চায়নি দেশে উৎপাদন বাড়ুক।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা যাই কিছু করি না কেন? সরকারের হাতে কিছু থাকতেই হয় নইলে বীজ উৎপাদন করব তার কোয়ালিটিও ঠিক থাকবে না। আর বিতরণ ক্ষেত্রে কোন সুশৃঙ্খলা আসে না। সার-বীজ থেকে কৃষি উপকরণ প্রতিটি জিনিস যেন আমাদের দেশের মানুষ সময়মতো পায়, সেটাই তো আমাদের লক্ষ্য। জাতির পিতা সে ব্যবস্থাগুলো করেছিলেন।’

‘কিন্তু দুভার্গ্য, আমরা দেখেছি সেই পদক্ষেপগুলো নষ্ট করে দিয়েছিল, পরবর্তী সরকার যারা এসেছিল। সেটা জিয়া সরকার, এরশাদ সরকার, খালেদা জিয়া সরকার; প্রত্যেকেরই চিন্তাভাবনা একটু বৈরী ছিল।’

যে কারণে সারের জন্য, সারের দাবি করতে যেয়ে ১৮ জন কৃষক নিহত হয়েছিল। আর আজকে বাংলাদেশে সার চাইতে, কৃষকের ধরনা দিতে হয় না। সার কৃষকের হাতে পৌঁছে যায় বলে যোগ করেন তিনি।

জাতির পিতা বলেছিলেন, ভিক্ষুক জাতির কোনো ইজ্জত থাকে না। আজকে আল্লাহর রহমতে আমাদের আর সেই দুর্দশা নেই। আমরা এখন খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করেছি এবং খাদ্য শস্য উৎপাদনে সারাবিশ্বে চতুর্থ স্থান করে আছি।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থা ও আয়তনের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘১৬ কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা আমাদের দিতে হবে। উৎপাদন বাড়াতে হবে। আমাদের জমির সীমাবদ্ধতা আছে। কিন্তু আমাদের জমি অত্যন্ত উর্বর। সেটা মাথায় রেখে আমাদের ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়েই সফলতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি।’

কৃষি গবেষণায় সবচেয়ে গুরুত্ব দেওয়ার কথা তুলে ধরে বলেন, ‘আমরা চাই আমাদের দেশ এগিয়ে যাক। আমাদের যেন কারও কাছে হাত পেতে চলতে না হয়। এটাই আমাদের লক্ষ্য। আমাদের নিজস্ব বাজার আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমরা নিজের দেশেও যেমন বিক্রি করতে পারবো। বিদেশেও রফতানি করতে পারবো।’

তাই প্রক্রিয়াজাতকরণের ওপর বিশেষভাবে নজর দেওয়া প্রয়োজন বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, এটি সকলেরই কর্তব্য। অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ এখন অনেক এগিয়ে গেছে। আর এগিয়ে গেছে বলেই আমরা কিন্তু আপনাদের (সরকারি চাকরিজীবী) বেতন ১২৩ ভাগ বৃদ্ধি করে দিয়েছি। এত বেতন কোনোদিন কোনো সরকার বাড়াতে পারে নাই। কিন্তু আমরা সেটাও করে দিয়েছি।’

খাদ্য উৎপাদানের পাশাপাশি আপদকালীন সময়ে খাদ্য মজুদের ওপর গুরুত্বারোপের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

এ বিষযে তিনি বলেন, ‘আজকে আমাদের অর্থনীতির সুফল তৃণমূল পর্যায়ের মানুষও পাচ্ছে। তাদের আর্থিক স্বচ্ছলতা বাড়ছে। কর্মসংস্থান হচ্ছে। এছাড়া বিদ্যুৎ ও রাস্তাঘাট তৈরি করে দেওয়ার কারণে মানুষ এখন যা উৎপাদন করে সেটাই বাজারজাত করার সুযোগ পাচ্ছে। এতে স্বাভাবিকভাবে আমরা অর্থনীতির দিকে আরও শক্তিশালী হচ্ছি এবং আমরা নিজেরাই এগিয়ে যাচ্ছি। আর আমরা এভাবেই এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আওয়ামী লীগের নীতি; আমরা সম্পূর্ণখাতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করব, কারও কাছে হাত পাতব না। আর বিএনপির নীতি খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা হওয়া যাবে না। বিদেশ থেকে ভিক্ষা আনতে হবে। তাই ভবিষ্যতে যেন বাংলাদেশকে কারও কাছে হাত ভিক্ষার হাত বাড়াতে না হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘সামনে আমাদের নির্বাচন, আমরা একটানা দুই টার্ম থাকলাম। তৃতীয় টার্মে জনগণ ভোট দিলে আসব, আর না দিলে আমরা বলতে পারি না! কিন্তু আমরা চাই যে অগ্রযাত্রাটা শুরু করেছি। সেটা যেন থেমে না থাকে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের অর্থনীতি কৃষির ওপর। আমরা সেটাকে গুরুত্ব দিয়েই কাজ করে যাচ্ছি। আজকে আমরা আমাদের বিশাল সমুদ্রসীমা অর্জন করেছি। এই সমুদ্র সম্পদ শুধু খনিজ পদার্থ না মৎস্যসহ আরও বহু ধরনের সমদ্র সম্পদ অর্জন করে আমাদের অর্থনীতিকে কাজে লাগাতে পারব। সে জন্য আমরা এরইমধ্যে ব্লু ইকোনমি হিসেবে ঘোষণা দিয়ে কাজ শুরু করেছি।’

কৃষিবিদদের বিভিন্ন চাওয়া পাওয়ার বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আপানারা নিজেরাই বলেছেন, নামমাত্র মূল্যে জমি দিয়েছি। যখন যা চেয়েছেন কখনো কার্পণ্য করিনি। তবে পেলেই যে চাইতে হবে, সেটাও ঠিক না। কারণ এটাও মাথায় রাখতে হবে। আমরা কিন্তু কাউকে বঞ্চিত করিনি। বেতন যখন বাড়িয়েছি সকলের জন্যই বাড়িয়েছি।’

কৃষিক্ষেত্রে কৃষিবিদদের অবদানের কথা স্বীকার করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এখানে চাওয়ার কিছু নেই। কাকে কখন কী দিতে হবে আর কতটুকু সুযোগ করে দিতে হবে, সে বিষয়ে আমাদের যথেষ্ট চিন্তাভাবনা আছে।’

‘আমরা শুধু এইটুকু চাই, আমাদের দেশ যেন ২১০০ সাল পর্যন্ত দেশের উন্নয়ন অব্যাহত রেখে জাতির পিতার স্বপ্নের ক্ষুধামুক্ত দারিদ্রমুক্ত সোনার বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারি। আপনারা আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করবেন’ বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here