বাংলাদেশের জনগণের প্রতি ভরসা ছিল বলেই নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু করতে পেরেছি বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

রবিবার মুন্সীগঞ্জের মাওয়া টোলপ্লাজা সংলগ্ন গোলচত্বরে দেশের বৃহত্তম অবকাঠামো পদ্মা সেতু প্রকল্পের অগ্রগতি এবং এর রেল সংযোগের নির্মাণ কাজ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। এসময় প্রধানমন্ত্রী পদ্মা সেতুর নামফলক উন্মোচন ও রেল সংযোগসহ চারটি প্রকল্পের ভিত্তি স্থাপন করেন।

তিনি বলেন, ‘অনেকের ধারণা ছিল বিশ্ব ব্যাংকের তহবিল ছাড়া পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ সম্ভব হবে না। কিন্তু আমার বিশ্বাস ছিল, এদেশের জনগণ আমার পাশে থাকবে। জনগণই আমার শক্তি। জনগণ আমাকে সমর্থন দিয়েছেন বলেই নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর ৬০ ভাগ কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।

শেখ হাসিনা বলেন, আমি কৃতজ্ঞতা জানাই বাংলাদেশের মানুষের কাছে। প্রবাসীরাও সবাই আমাকে আশ্বাস দিয়েছে। বাংলার মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে কাজ করি।

তিনি বলেন, আমরা আজ নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর কাজ শুরু করেছি। পদ্মা সেতু নিয়ে আমার সরকার ও পরিবারের নামে দুর্নীতির কথা ওঠে। পদ্মা সেতুর জন্য আমাদের জাতীয়-আন্তর্জাতিকভাবে ষড়যন্ত্রের শিকার হতে হয়েছে, অপমানিত হতে হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৭ই মার্চের ভাষণে জাতির পিতা বলেছিলেন কেউ দাবাইয়া রাখতে পারবা না। বাঙালিকে কেউ দাবাইয়া রাখতে পারে না।

তিনি বলেন, বহুমুখী পদ্মা সেতু ৭৫০ মিটার দৃশ্যমান হয়েছে। এ সেতুর কাজ করা অনেক কঠিন। খরস্রোতা নদী তাই সেতু নির্মাণ অনেক কঠিন ছিল। এরইমধ্যে ৬০ ভাগ কাজ শেষে হয়েছে।

শেখ হাসিনা বলেন, যারা জমি দিয়েছে তাদের জন্য আমরা প্লট দিয়েছি, তাদের জন্য বাড়তি অর্থ বরাদ্দ দিয়েছি। তাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। তারা এ সেতুর জন্য ভিটে বাড়িও ছেড়ে দিয়েছেন।

দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে ২০০১ সালের ১২ জুলাই মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের কুমারভোগ এলাকায় পদ্মা সেতু নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর ২০১৩ সালের ৪ মে নিজ অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী। ১২ ডিসেম্বর ২০১৫ সালে মুন্সীগঞ্জের মাওয়ায় পদ্মা সেতুর বাস্তবায়নের মূল পাইলিং কাজের উদ্বোধন করেন।

শেখ হাসিনা বলেন, সাহসের সঙ্গে সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে কোটি মানুষের প্রাণের দাবি পূরণ করতে চলেছি। সব চক্রান্ত রুখে দিয়ে বিশ্বের কাছে আমরা প্রমাণ করেছি, আমরা পারি। কারণ বাঙালিকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না।

তিনি আরও বলেন, পদ্মা বহুমুখী সেতুর কাজ সন্তোষজনকভাবে এগিয়ে চলছে। পদ্মা সেতু দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের যাতায়াতের সুবিধা বাড়বে, ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে এবং তাদের জীবনযাত্রার উন্নয়ন হবে।

শেখ হাসিনা বলেন, পদ্মাসেতু প্রকল্প দেশের সর্ববৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প। সেতুটির নির্মাণ কাজ টেকনিক্যাল, সময়সাপেক্ষ ও চ্যালেঞ্জিং। গুণগতমান শতভাগ ঠিক রাখার স্বার্থে আমাদের ধৈর্য্য ও সতর্কতার সঙ্গে এর সফল বাস্তবায়নে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।

নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ ড. ইউনূসের পদ্মা সেতু নিয়ে ষড়যন্ত্রের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তাঁর কথায় পদ্মাসেতুতে অর্থায়ন বন্ধ করে দিয়েছিল বিশ্বব্যাংক। তিনি বলেন, গরীব মানুষকে সহায়তা করার কথা বলে গ্রামীণ ব্যাংকের লাইসেন্স নিয়েছিলেন ইউনূস।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে আমরা গ্রামীণ ফোনের লাইসেন্স দিই। লাইসেন্স নেওয়ার সময় ড. ইউনূস বলেছিলেন, এর লভ্যাংশ রাষ্ট্রীয় কোষাগারেও ‍যুক্ত হবে। কিন্তু রাষ্ট্র এর কোনো সুফল পায় নি। উল্টো মানুষের পকেট কেটে বড়লোক হন উনি।

গ্রামীণ ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেদিন ড. ইউনূস বলেছিলেন, দরিদ্র মানুষের সহায়তায় গ্রামীণ ব্যাংক করবেন। আমরা তাই লাইসেন্স দিয়েছিলাম। এছাড়াও বহু সরকারি সুযোগ এই ব্যাংকটি গ্রহণ করে। বিশেষ করে ১৯৯৮ সালের বন্যার সময় ৪০০ কোটি টাকা সরকারি বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু এই ব্যাংকের সেবা দেশের মানুষ পায়নি। উল্টো সুদ দিতে দিতে নি:স্ব হতে হয়েছে গ্রামের মা-বোনদের।

ড. ইউনূসকে গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি পদ থেকে অপসারণ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, ব্যাংকটির একটি নিয়ম আছে যে, ৬০ বছরের বেশি কোনো মানুষ এর এমডি হতে পারবেন না। কিন্তু ড. ইউনূসের বয়স ৭০ ছাড়িয়ে যায়। তখন বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে তাঁকে একটা চিঠি দিয়ে এই পদ থেকে স্বেচ্ছায় সরে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়। তাকে এও বলা হয়েছিল যে, আপনাকে ব্যাংকটির অ্যামিরেটাস উপদেষ্টা করা হবে। তিনি তাতে রাজি হলেন না। উল্টো মামলা করলেন।

ড. ইউনূসকে এমডি পদ থেকে সরকার সরায় নি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি যে মামলা করলেন সেই মামলায় হেরে গেলেন। এখানে আমাদের কি করার ছিল? মামলায় হেরে গিয়ে তিনি পদ হারালেন। এতে তিনি ক্ষুব্ধ হলেন।

গ্রামীণ ব্যাংকের পদ ফিরে পেতে দেশে বিদেশে লবিং শুরু করলেন। দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রে মেতে উঠলেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের কাছে অভিযোগ করলেন। হিলারি ক্লিনটন আমাকে ফোন করে ড. ইউনূসকে এমডি পদে রাখতে বললেন। আমি বললাম আদালতে মামলা করে পদ হারিয়েছেন ইউনূস। এছাড়া ব্যাংকের নিয়ম তো ৬০ বছরের বেশি কেউ এমডি থাকতে পারবেন না। এতে আমার কি করার আছে। ক্লিনটনকে দিয়ে ইউনূছ ফোন করালেন যে, এমডি পদ ফেরত দেওয়া না হলে পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন বন্ধ করে দেওয়া হবে।

শুধু তাই নয়, ড. ইউনূছ তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের স্ত্রী শেরি ব্লেয়ারকে দিয়েও সুপারিশ করিয়েছেন যেন এমডি পদে রাখা হয়। নতুবা পদ্মা সেতুতে বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়ন আটকে দেওয়া হবে বলে হুমকি দেওয়া হয়। এভাবে তিনি পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন বন্ধ করান।

এর আগে, রোববার সকাল ১১টা ১৫ মিনিটের সময় তিনি মাওয়ার অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত হয়ে নামফলক উন্মোচন করেন। পদ্মা সেতুর চলমান কাজের উদ্বোধনের পাশাপাশি রেল সংযোগের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন, এক্সপ্রেসওয়ে পরিদর্শন ও নদী শাসন প্রকল্পের উদ্বোধনও করেন।

এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক, সেনাবাহিনী প্রধান আব্দুল আজিজ, মুন্সিগঞ্জ ২ আসনের সংসদ সদস্য সাগুফতা ইয়াসমিন, মুন্সিগঞ্জ ৩ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস, আওয়ামী লীগ জেলা সভাপতি মো. মহিউদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক লুৎফর রহমান, প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও স্থানীয় নেতারা।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here