আল্লাহ পাক যুগে যুগে হেদায়েত ও সত্য দ্বীনসহ নবী রাসূল পাঠিয়েছেন, যাতে দ্বীনকে পৃথিবীর অন্য সকল প্রকার  মতবাদের ওপর বিজয়ী করা যায়। সুরা তাওবা- ৩৩ আয়াতে আল্লাহ পাক বলেন, আল্লাহই তার রাসূলকে হেদায়েত (বাস্তবায়নের পথ) ও সত্য দ্বীন (দ্বীন মানে জীবন বিধান) সহকারে পাঠিয়েছেন যাতে তিনি একে সকল প্রকার বিধানের ওপর বিজয়ী করেন, মুশরিকরা তা যতই অপছন্দ করুক না কেন।

পৃথিবীতে মহান আল্লাহ অসংখ্য নবী রাসূল পাঠিয়েছেন । কিন্তু নবীদের প্রকৃত সংখ্যা সম্পর্কে সম্পূর্ণ সঠিক তথ্য কারো কাছেই নেই । এ ব্যাপারে হযরত আবুজার গিফারী (রাঃ) বর্ণিত রাসূল (সাঃ)-এর এ সংক্রান্ত হাদীসই আমাদের একমাত্র সম্বল। ঐ হাদীসের তথ্য অনুসারে নবীদের সংখ্যা ১ লক্ষ ২৪ হাজার এবং ৩১৫ জন হল রাসূল। (মিশকাত হা/৫৭৩৭, সিলসিলা ছহীহাহ হা/২৬৬৮)

এদের মধ্যে থেকে মাত্র শতাধিক নবী রাসূলের নাম কুরআন ও হাদীসে পাওয়া যায়। আবার এদের মধ্যে অনেকের কেবল মাত্র নামই পাওয়া যায়, বিস্তারিত কিছু পাওয়া যায় না। আর যাদের নিয়ে কিছু আলোচনা আছে, তাদের জীবিকার মাধ্যম কি ছিল তা সঠিকভাবে জানা যায় না। তবে আজ আমি এখানে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর একটি হাদীসের সূত্রধরে কয়েকজন নবী রাসূলের জীবিকার মাধ্যম নিয়ে আলোচনা করব।

হযরত আদম (আঃ) এর জীবিকার মাধ্যম :

আদম (আঃ) দুনিয়ার প্রথম মানব ও প্রথম নবী। আল্লাহ পাক আদম (আঃ)-কে নিজে সরাসরি সৃষ্টি করেন। সূরা সোয়াদের ৭৫ নং আয়াতে আল্লাহ পাক বলেন, হে ইবলিস, আমার নিজ হাতে আমি যাকে সৃষ্টি করেছি তার প্রতি সিজদাবনত হতে কিসে তোমাকে বাধা দিল? তুমি কি অহংকার করলে, না তুমি উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন?

আব্বাস (রাঃ) এর হাদীস থেকে জানা যায় যে, আদম (আঃ) এর জীবিকার মাধ্যম ছিল কৃষিকার্য। সর্বপ্রথম আদম (আঃ)-এর উপরে যে সব অহী নাযিল করা হয়েছিল, তার অধিকাংশ ছিল ভূমি আবাদ করা, কৃষিকার্য ও শিল্প সংক্রান্ত। যাতায়াত ও পরিবহনের জন্য চাকা চালিত গাড়ি সর্বপ্রথম আদম (আঃ) আবিষ্কার করেন। কালের বিবর্তনে নানাবিধ মডেলের গাড়ি এখন চালু হয়েছে। কিন্তু সব গাড়ি ভিত্তি হল চাকার উপরে। বলা চলে যে, সভ্যতা এগিয়ে চলেছে চাকার উপরে ভিত্তি করে। অতএব যিনি প্রথম এটা চালু করেন, তিনিই বড় আবিষ্কারক। আর তিনি ছিলেন আমাদের আদি পিতা প্রথম মানুষ ও প্রথম নবী হযরত আদম (আলাইহিস সালাম)। যা তিনি অহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত হয়েছিলেন। (তাসফীর মাআরেফুল কুরআন পৃঃ ৬২৯)

আদমের যুগে পৃথিবীর প্রথম কৃষিপণ্য ছিল তীন ফল। সম্প্রতি ফিলিস্তিনের মাটির তলে শুকনা তীন ফলের যে ফসিল পাওয়া গেছে, তা দশ হাজার বছর পূর্বেকার। মানুষের বসবাস ও জীবনযাত্রা তখন থেকেই পৃথিবীতে শুরু হয়েছে। হিসাবে দেখা গেছে যে, পৃথিবীতে আদম (আঃ)-এর আগমন ঘটেছিল দশ হাজার বছর পূর্বে। তিনি যে তীন বৃক্ষের প্রথম আবাদ করেছিলেন, তার প্রমাণ পাওয়া গেল বর্তমান যুগে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মাধ্যমে। হয়ত ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলি প্রকাশিত হবে।

হযরত নূহ (আঃ) এর জীবিকার মাধ্যম :

নূহ (আঃ) হলেন আবুল বাশার ছানি বা মানবজাতির দ্বিতীয় পিতা। তিনি আদম আদম (আঃ)-এর দশম অথবা অষ্টম পুরুষ। তিনি ছিলেন দুনিয়াতে ১ম রাসূল। (মুসলিম হা/৩২৭ ঈমান অধ্যায় ৮৪ অনুচ্ছেদ)

আব্বাস (রাঃ) এর হাদীস থেকে জানা যায় যে, তিনি একজন কাঠমিস্ত্রী ছিলেন। নূহ (আঃ)কে নিয়ে পবিত্র কুরআনে বর্নিত ঘটনার দিকে তাকালেই বুঝা যায় তিনি একজন দক্ষ কাঠমিস্ত্রী ছিলেন। যেমন আল্লাহ পাক সূরা হুদ এর ৩৭ নং আয়াতে বলেন, তুমি নৌকা তৈরি কর আমাদের চোখের সম্মুখে ও অহী অনুসারে।

এই আয়াত থেকে বুঝা যায় যে, নৌকা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণসমূহ ও নির্মাণ কৌশল জিবরাঈল (আঃ) নূহ (আঃ)-কে শিক্ষা দিয়েছিলেন। এভাবে সরাসরি অহীর মাধ্যমে নূহ (আঃ)-এর হাতে নৌকা ও জাহাজ নির্মাণ শিল্পের গোড়াপত্তন হয়। অতঃপর যুগে যুগে তার উন্নতি সাধিত হয়েছে এবং মানুষ ব্যবসা-বাণিজ্যের মালামাল ও যাত্রী পরিবহনে নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। আধুনিক বিশ্ব সভ্যতা যার উপরে দাঁড়িয়ে আছে।

হযরত ইদরীস (আঃ) এর জীবিকা :

তিনি ছিলেন একজন বিখ্যাত নবী। তাঁর নামে বহু উপকথা তাফসীরের কিতাবসমূহে বর্ণিত হয়েছে। যে কারণে তিনি মানুষের কাছে অতি পরিচিত। হযরত ইদরীস (আঃ) হযরত নূহ (আঃ)-এর পূর্বের নবী ছিলেন, না পরের নবী ছিলেন এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তবে অধিকাংশ সাহাবীর মতে তিনি নূহ (আঃ)-এর পরের নবী ছিলেন। (তাফসীর মাআরেফুল কুরআন পৃঃ ৪৫২)

 

আব্বাস (রাঃ) এর হাদীস থেকে জানা যায় যে, হযরত ইদ্রিস (আঃ) ছিলেন দর্জি। তিনি কাপড় সেলাই করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তাফসীরে কুরতুবীতে, মারিয়াম ৫৬ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে যে, হযরত ইদরীস (আঃ) হলেন প্রথম মানব, যাঁকে মু’জেযা হিসাবে জ্যোতির্বিজ্ঞান ও অংকবিজ্ঞান দান করা হয়েছিল। তিনিই সর্বপ্রথম মানব, যিনি আল্লাহর ইলহাম মতে কলমের সাহায্যে লিখন পদ্ধতি ও বস্ত্র সেলাই শিল্পের সূচনা করেন। তাঁর পূর্বে মানুষ সাধারণত পোশাক হিসাবে জীবজন্তুর চামড়া ব্যবহার করত। ওজন ও পরিমাপের পদ্ধতি তিনিই সর্বপ্রথম আবিষ্কার করেন এবং লোহা দ্বারা অস্ত্র-শস্ত্র তৈরির পদ্ধতি আবিষ্কার ও তার ব্যবহার তাঁর আমল থেকেই শুরু হয়। তিনি অস্ত্র নির্মাণ করে ক্বাবীল গোত্রের বিরুদ্ধে জেহাদ করেন।

হযরত দাঊদ (আঃ) এর জীবিকার মাধ্যম :

পৃথিবীতে বিপুল শক্তি ও রাষ্ট্রক্ষমতার আধিকারী ছিলেন  দু’জন নবী। একজন দাঊদ (আঃ) অপরজন হলেন তার পুত্র সুলাইমান (আঃ)। বর্তমান ফিলিস্তিনসহ সমগ্র ইরাক ও শাম (সিরিয়া) এলাকায় তাঁদের রাজত্ব ছিল। পৃথিবীর অতুলনীয় ক্ষমতার অধিকারী হয়েও তাঁরা ছিলেন সর্বদা আল্লাহর প্রতি অনুগত ও সদা কৃতজ্ঞ। সেকারণ আল্লাহ তার শেষনবীকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন–

তারা যেসব কথা বলে তাতে তুমি ছবর কর এবং আমার শক্তিশালী বান্দা দাঊদকে স্মরণ কর। সে ছিল আমার প্রতি সদা প্রত্যাবর্তনশীল (সূরা ছোয়াদ, আয়াত ১৭)

আব্বাস (রাঃ) এর হাদীস থেকে জানা যায় যে, দাঊদ (আঃ) ছিলেন একজন দক্ষ লৌহবর্মক প্রস্তুতকারক। যা বিক্রি করে তিনি সংসার যাত্রা নির্বাহ করতেন। রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে নিজের ভরণপোষণের জন্য কিছুই নিতেন না। যদিও সেটা নেওয়া কোন দোষের ছিল না। এখানে লোহাকে বাস্তবে মোমের মত নরম করার প্রকাশ্য অর্থ নিলে সেটা হবে তাঁর জন্য মু’জেযা স্বরূপ, যা মোটেই অসম্ভব নয়। অবশ্য নরম করে দেওয়ার অর্থ লোহাকে সহজে ইচ্ছামত রূপ দেওয়ার ও উন্নতমানের নির্মাণ কৌশল শিক্ষাদানও হতে পারে। যেমন আল্লাহ বলেন–

…এবং আমরা তার জন্য লোহাকে নরম করে দিয়েছিলাম এবং তাকে বলেছিলাম প্রশস্ত বর্ম তৈরি কর ও কড়াসমূহ যথাযথভাবে সংযুক্ত কর এবং তোমরা সৎকর্ম সম্পাদন কর। তোমরা যা কিছু কর, তা আমরা দেখে থাকি (সূরা সাবা, আয়াত ১০-১১)

এবং সূরা আম্বিয়ার ৮০ নং আয়াতে আল্লাহ পাক বলেন– আর আমরা তাকে তোমাদের জন্য বর্ম নির্মাণ কৌশল শিক্ষা দিয়েছিলাম, যাতে তা যুদ্ধের সময় তোমাদেরকে রক্ষা করে। অতএব তোমরা কি কৃতজ্ঞ হবে?

হযরত মূসা (আঃ) এর জীবিকার মাধ্যম :

মূসা (আঃ) হলেন ইবরাহীম (আঃ)-এর ৮ম অধঃস্তন পুরুষ। মূসা (আঃ)-এর পিতার নাম ছিল ইমরান ও মাতার নাম ছিল ইউহানিব। তবে মায়ের নামের ব্যাপারে মতভেদ আছে। মূসা (আঃ) বনী ইসরাঈলের প্রতি প্রেরিত একজন নবী। উল্লেখ্য যে, মূসার জন্ম হয় মিশরে এবং লালিত-পালিত হন মিশর সম্রাট ফেরাঊনের ঘরে।

হযরত আব্বাস (রাঃ) এর হাদীস থেকে জানা যায় যে, মুসা (আঃ) ছিলেন রাখাল। মাদিয়ানে হিজরতের পর ঘটনাক্রমে হযরত শুআয়েব (আঃ) এর সাথে সাক্ষাত হয় এবং তার এক মেয়েকে বিবাহ করেন। অতঃপর সেখানে দীর্ঘ দশ বছর মেষপালকের চাকুরি করেন। পবিত্র কুরআনের সূরা ক্বাছাছের ২৭ নং আয়াতে ঘটনাটা বর্ণিত হয়েছে। যেমন আয়াতটি হল,

তখন তিনি মূসাকে লক্ষ্য করে বললেন, আমি আমার এই কন্যাদ্বয়ের একজনকে তোমার সাথে বিবাহ দিতে চাই এই শর্তে যে, তুমি আট বছর আমার বাড়িতে কর্মচারী থাকবে। তবে যদি দশ বছর পূর্ণ করো, সেটা তোমার ইচ্ছা। আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাই না। আল্লাহ চাহেন তো তুমি আমাকে সদাচারী হিসাবে পাবে। মূসা বলল, আমার ও আপনার মধ্যে এই চুক্তি স্থির হল। দুটি মেয়াদের মধ্য থেকে যেকোন একটি পূর্ণ করলে আমার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ থাকবে না। আমরা যা বলছি, আল্লাহ তার উপরে তত্ত্বাবধায়ক। মূলতঃ এটাই ছিল তাদের বিয়ের মোহরানা।

হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর জীবিকার মাধ্যম :

শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কুরাইশ গোত্রের বনী হাশিম বংশে ৯ই বা ১২ই রবিউল আওয়াল ছুবহে সাদিকের পর জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ছিল আব্দুল্লাহ, মাতার নাম আমেনা।

হযরত আব্বাস (রাঃ) এর হাদীস থেকে জানা যায় যে, হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ছিলেন একজন সৎ ব্যবসায়ী। সর্বপ্রথম ১০ বা ১২ বছর বয়সে চাচার সাথে ব্যবসা উপলক্ষে সিরিয়ার বসরা শহরে গমন করেন। তখন কুরাইশ বংশে অনেকে ছিলেন, যারা ব্যবসায়ে পুঁজি বিনিয়োগ করতেন। কিন্তু নিজেরা সরাসরি ব্যবসায়িক সফরে যেতেন না। এজন্য তারা সর্বদা বিশ্বস্ত ও আমানতদার লোক তালাশ করতেন। খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ ছিলেন এমন একজন ব্যবসায়ী মহিলা। মুহাম্মদ (সঃ) সততা ও আমানতদারীর কথা শুনে তিনি তাঁর নিকট ব্যবসায়ের প্রস্তাব পাঠান। চাচার সাথে পরামর্শক্রমে তিনি এতে রাজি হন। অতঃপর খাদিজার গোলামকে নিয়ে প্রথম ব্যবসায়িক সফরে তিনি সিরিয়া গমন করেন। এবং এত বেশি লাভ নিয়ে ফিরে আসেন যে, খাদিজা ইতিপূর্বে কারু কাছ থেকে এত লাভ পাননি।

অবশেষে বলা যায় যে, আল্লাহ তায়ালা ইহলৌকিক কাজও নবী রাসূলদের মাধ্যমে দুনিয়ার মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন। দুনিয়ার জীবনে মানুষের প্রয়োজনীয় সকল কাজ আল্লাহ পাক অহীর মাধ্যমে শিক্ষা দিয়েছেন।

হাফেয শামসুদ্দীন যাহাবী (রহঃ) তালাবুন নাবাবি কিতাবে বলেন, মানুষের দুনিয়াবী জীবনে প্রয়োজনীয় সর্বপ্রকার শিল্পকর্ম অহীর মাধ্যমে কোন না কোন নবীর হাতে শুরু হয়েছে। অতঃপর যুগে যুগে তার উন্নতি ও উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here