সত্যবাদিতা সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে আল্লাহপাক বলেছেন, ‘হে ইমানদাররা! আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সহযোগী হও।’ (সুরা তাওবা, আয়াত : ১১৯)। …

সত্যবাদিতা সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে আল্লাহপাক বলেছেন, ‘হে ইমানদাররা! আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সহযোগী হও।’ (সুরা তাওবা, আয়াত : ১১৯)।

পবিত্র কোরআন ও হাদিসে মিথ্যাবাদীর ভয়ানক পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে। একটি মিথ্যাকে সত্য বলে প্রমাণ করার জন্য নানা ছলচাতুরীর আশ্রয় গ্রহণ করা হয়। তারপরও মিথ্যা মিথ্যাই থেকে যায়। মিথ্যাকে সত্য ও সত্যকে মিথ্যা দিয়ে ঢাকা যায় না। মিথ্যাচার করাই যাদের অভ্যাস তারা সংসারে, সমাজে এবং দেশে নানা সমস্যা ও অশান্তি সৃষ্টি করতে পারে।

মিথ্যাবাদীর কবলে পড়ে প্রায়ই সমাজের নিরীহ মানুষ প্রতারিত হয়ে থাকেন। মিত্যাবাদীর ওপর আল্লাহ্পাকের অভিশাপ বর্ষিত হয়। মিথ্যাবাদী ক্রমশ মানসিক শক্তি ও সৎসাহস হারিয়ে ফেলে। তখন তার হিতাহিত জ্ঞান থাকে না।স্বীয় স্বার্থে যে কোনো কাজ করতে সে দ্বিধা করে না। যে মিথ্যাকে ত্যাগ করতে পারে সে কোনো প্রকার অন্যায় কাজ করতে পারে না। সকল পাপের মূল হচ্ছে মিথ্যা বলা।

একদা এক পাপিষ্ট মহানবী (সাঃ) এর দরবারে হাজির হয়ে বললো, হে রাসূলুল্লাহ! আমি সবরকম অপরাধের সাথে যুক্ত। আমি কীভাবে এ চরম পাপাসক্তি থেকে রেহাই পেতে পারি? লোকটির কথা শ্রবণ করে মহানবী (সাঃ) বুঝলেন, সত্যি সত্যি লোকটি সৎপথে আসার উপায় খুঁজছে।

তিনি চিন্তা করলেন, লোকটির মধ্যে যতো রকম অন্যায় কাজ রয়েছে তা যদি আমি বর্জন করতে বলি তাহলে হয়তো তার পক্ষে সবগুলো একসাথে বর্জন করা সম্ভব হবে না। তাই মহানবী (সাঃ) বললেন, তুমি আজ থেকে মিথ্যা কথা বলা ত্যাগ কর। দেখবে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

মহানবী (সাঃ) এর উপদেশকে সহজসাধ্য ভেবে সন্তুষ্ট হয়ে লোকটি মিথ্যা না বলার সংকল্প করল। এরপর সে নিজের বাড়ি যাওয়ার পর যখন নামাজের সময় উপস্থিত হলো তখন সে চিন্তা করল এখন যদি আমি নামাজ আদায় না করি তাহলে আগামীকাল মহানবী (সাঃ) এর কাছে যাই, তখন তিনি যদি আমাকে জিজ্ঞেস করেন, গতকাল তুমি কি নামাজ পড়েছিলে- তখন আমি কি উত্তর দেবো? লোকটি জবাবদিহিতার ভয়ে সময়মতো নামাজ আদায় করল।

রাতের বেলায় একটি নির্দিষ্ট সময়ে মদ্যপান করা লোকটির আরেকটি বদ অভ্যাস ছিল। রাতে মদ্যপানের সময় উপস্থিত হলে মহানবী (সাঃ)-এর কাছে কৃত ওয়াদার কথা তার স্মরণ হয়ে গেল। এসব চিন্তা করে সে মদের গ্লাস ছুঁড়ে ফেলে দিলো। মিথ্যা বলার ভয়ে সে সব রকম পাপ থেকে বিরত রইল। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) জানতেন, মিথ্যা বলা এমনই জঘন্য অপরাধ, তা ত্যাগ করতে পারলে সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত থাকা যায়। এজন্য মিথ্যাকে সকল পাপের উৎস বলা হয়ে থাকে।

মিথ্যা বলার পরিণাম খুবই ধ্বংসাত্মক। এর জন্য দুনিয়াতে রয়েছে ধ্বংস আর আখিরাতে রয়েছে অপমান ও লাঞ্ছনা। মিথ্যার কারণে অন্তরে কপটতার সৃষ্টি হয়। মিথ্যা পাপাচার ও জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়। মিথ্যাবাদীদের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয় না। মিথ্যার কারণে দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতেই চেহারা বিবর্ণ ও মলিন হয়ে যায়। বিচার দিবসে মিথ্যাবাদীর চোয়াল চিরে গর্দান পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হবে। রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘ধ্বংস তার জন্য যে লোক হাসানোর জন্য কথা বলে এবং এতে সে মিথ্যার আশ্রয় নেয়। ধ্বংস তার জন্য, ধ্বংস তার জন্য’ (তিরমিজি ও আবু দাউদ)।

আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিথ্যা পরিহার করা ও সত্য বলার বিষয়ে অনেক বেশি সতর্ক করেছেন। একটি হাদিসে তিনি ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা সত্যকে অবলম্বন করো। কারণ সত্যবাদিতা ভালো কাজে উপনীত করে। আর ভালো কাজ উপনীত করে জান্নাতে। মানুষ সত্য বলে ও সত্যবাদিতার অন্বেষায় থাকে। একপর্যায়ে সে আল্লাহর কাছে সত্যবাদী হিসেবে লিখিত হয়ে যায়। আর মিথ্যা থেকে দূরে থাকে। কারণ মিথ্যা উপনীত করে পাপাচারে। আর পাপাচার উপনীত করে জাহান্নামে। যে ব্যক্তি মিথ্যা বলে ও মিথ্যার অন্বেষায় থাকে, এভাবে একসময় আল্লাহর কাছে সে চরম মিথ্যুক হিসেবে লিখিত হয়ে যায়’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬০৭)।

মিথ্যা ইসলামের দৃষ্টিতে অতি গর্হিত, অবশ্য-বর্জনীয়। মিথ্যাবাদিতা মুনাফিকের বৈশিষ্ট্য। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ মিথ্যাবাদীর শাস্তির কথা উল্লেখ করে ইরশাদ করেছেন, ‘তাদের হৃদয়ে আছে একটি রোগ, আল্লাহ সে রোগ আরও বেশি বাড়িয়ে দিয়েছেন, আর যে মিথ্যা তারা বলে তার বিনিময়ে তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।’ ওদের যখন বলা হয়, তোমরা পৃথিবীতে অনাচার করো না, তারা বলে, আমরা তো শান্তি স্থাপনকারী। জেনে রাখো, ওরাই অনাচার বিস্তারকারী, কিন্তু ওদের চেতনা নেই’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১০-১২)।

বিচার দিবসে আল্লাহ্পাক মিথ্যা বলে বেচাকেনাকারীর সাথে কথা বলবেন না। হাসি-তাশা, কিংবা স্বাভাবিক অবস্থা-মিথ্যা সর্বাবস্থায় নিষেধ, শিশুদের সাথে রসিকতা কিংবা খেলাধুলাতেও মিথ্যা থেকে বিরত থাকার কঠোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কারণ এটা বাচ্চাদের অন্তর গেঁথে যায় এবং তাদের কে মিথ্যা বলতে উৎসাহ জোগায়। আল্লাহ্তায়ালা বলেন, ‘মিথ্যা তো তারাই সৃষ্টি করে যারা আমার নিদর্শনগুলোর ওপর আস্থা বা ইমান রাখে না। প্রকৃতপক্ষে তারাই মিথ্যাবাদী’ (সূরা নাহাল ১০৫)

মহানবী (সাঃ) বলেছেন, কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট, সে যা শোনে তাই লোকসমাজে বলে বেড়ায়। (মুসলিম) মিথ্যা বলার পরিণাম খুবই ভয়াবহ। মিথ্যাবাদীর জন্য দুনিয়াতে রয়েছে ধ্বংস, অপমান ও লাঞ্ছনা এবং আখেরাতে তার জন্য অপেক্ষা করছে জাহান্নাম।

কখনও কি মিথ্যা বলার অনুমতি আছে?

উত্তর: নিঃসন্দেহে মিথ্যা বলা হারাম। তবুও কয়েকটি ক্ষেত্রে বিশেষ শর্তসাপেক্ষে তা বৈধ।

কথাবার্তা উদ্দেশ্য সফল হওয়ার অন্যতম মাধ্যম। সুতরাং কোন সৎ উদ্দেশ্য যদি মিথ্যার আশ্রয় ব্যতিরেকে সাধন সম্ভবপর হয়, তাহলে সে ক্ষেত্রে মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া বৈধ নয়। পক্ষান্তরে সে সৎ উদ্দেশ্য যদি মিথ্যা বলা ছাড়া সাধন সম্ভব না হয়, তাহলে সে ক্ষেত্রে মিথ্যা বলা বৈধ। পরন্তু যদি বাঞ্ছিত লক্ষ্য বৈধ পর্যায়ের হয়, তাহলে মিথ্যা বলা বৈধ হবে।

আর যদি অভীষ্ট লক্ষ্য ওয়াজেবের পর্যায়ভুক্ত হয়, তাহলে তা অর্জনের জন্য মিথ্যা বলাও ওয়াজেব হবে। যেমন কোন মুসলিম এমন অত্যাচারী থেকে আত্মগোপন করেছে, যে তাকে হত্যা করতে চায় অথবা তার মাল-ধন ছিনিয়ে নিতে চায় এবং সে তা লুকিয়ে রেখেছে। এখন যদি কেউ তার সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হয় [যে তার ঠিকানা জানে], তাহলে সে ক্ষেত্রে তাকে গোপন [ও নিরাপদ] রাখার জন্য তার পক্ষে মিথ্যা বলা ওয়াজেব।

অনুরূপভাবে যদি কারো নিকট অপরের আমানত থাকে, আর কোন জালেম যদি তা বলপূর্বক ছিনিয়ে নিতে চায়, তাহলে তা গোপন করার জন্য মিথ্যা বলা ওয়াজেব। অবশ্য এ সমস্ত বিষয়ে সরাসরি স্পষ্টাক্ষরে মিথ্যা না বলে ‘তাওরিয়াহ’ করার পদ্ধতি অবলম্বন করাই উত্তম।

‘তাওরিয়াহ’ হল এমন বাক্য ব্যবহার করা, যার অর্থ ও উদ্দেশ্য শুদ্ধ তথা তাতে সে মিথ্যাবাদী নয়; যদিও বাহ্যিক শব্দার্থে এবং সম্বোধিত ব্যক্তির বুঝ মতে সে মিথ্যাবাদী হয়। পক্ষান্তরে যদি উক্ত পরিস্থিতিতে ‘তাওরিয়াহ’ পরিহার করে প্রকাশ্যভাবে মিথ্যা বলা হয়, তবুও তা হারাম নয়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে মিথ্যা বলার বৈধতার প্রমাণে উলামায়ে কিরাম উম্মে কুলসুম কর্তৃক বর্ণিত হাদিসটি পেশ করেন।

# উম্মে কুলসুম রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেন যে, ‘‘লোকের মধ্যে সন্ধি স্থাপনকারী মিথ্যাবাদী নয়। সে হয় ভাল কথা পৌঁছায়, না হয় ভাল কথা বলে।’’ (বুখারী ও মুসলিম)

# উম্মে কুলসুম রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, তাঁকে মানুষের কথাবার্তায় মিথ্যা বলার অনুমতি দিতে শুনিনি,

তিন ক্ষেত্র ছাড়া:

[১] যুদ্ধকালে

[২] লোকদের ঝগড়া মিটাবার ক্ষেত্রে ও

[৩] স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের [প্রেম বর্ধক] কথোপকথনে। (মুসলিম)

স্বামী স্ত্রী একে অন্যকে খুশি করার জন্য ছোট মিথ্যা বলতে পারে। যেমন, রান্না ভাল না হলেও স্বামী বলল খুব ভাল রান্না হইছে। এরূপ গৃহস্থালী জিনিস।

আসুন আমরা কথা-বার্তায়, চাল-চলনে অর্থাৎ জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে মিথ্যা পরিহার করে সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য সচেষ্ট হই। আল্লাহ আমাদের সকল অবস্থায় মিথ্যা পরিহার করার তাওফিক দিন আমিন।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here