দেশের শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ।

জনগণের প্রত্যাশা পূরণের জন্য সরকারি ও বিরোধী দলসহ সকল সাংসদকে সম্মিলিতভাবে যথাযথ ও কার্যকর ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।

রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘জাতীয় ঐকমত্য ব্যতীত শান্তি ও সমৃদ্ধি স্থায়ী রূপ পেতে পারে না। গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা, আইনের শাসন ও অব্যাহত আর্থসামাজিক উন্নয়নের মত মৌলিক প্রশ্নে সকল রাজনৈতিক দল, শ্রেণি ও পেশা নির্বিশেষে সকলের ঐকমত্য গড়ে তোলার সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য আমি আহ্বান জানাই।’

তিনি আরও বলেন, ‘জাতীয় সংসদ দেশের জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রবিন্দু। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, পরমসহিষ্ণুতা, মানবাধিকার ও আইনের শাসন সুসংহতকরণ এবং জাতির অগ্রযাত্রার স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার সফল বাস্তবায়নে সরকারি দলের পাশাপাশি বিরোধী দলকেও গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে হবে।’

বুধবার সন্ধ্যায় একাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম দিনে উদ্বোধনী অধিবেশনে ভাষণ দেন রাষ্ট্রপতি। সন্ধ্যা ৬টা ১৬ মিনিটে তিনি ভাষণ শুরু করেন। যা শেষ হয় সন্ধ্যা ৭টা ২৪ মিনিটের দিকে।

রাষ্ট্রপতি তার ভাষণে অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি, বিদ্যুৎ, বৈদেশিক সম্পর্ক, পর্যটন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারী ও শিশু উন্নয়ন, গ্রামীণ উন্নয়ন, প্রবাসী কল্যাণ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) এবং জন প্রশাসনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিগত সরকারের সাফল্য ও অর্জন তুলে ধরেন।

রাষ্ট্রপতির ভাষণের সময় সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং নবনির্বাচিত স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।

চিকিৎসার জন্য বিদেশে থাকায় বিরোধী দলের নেতা এইচএম এরশাদ অনুপস্থিত থাকলেও বিরোধী দলের উপনেতা জিএম কাদের এসময় উপস্থিত ছিলেন।

রাষ্ট্রপতি বলেন, বাংলাদেশ ২০২০ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী এবং ২০২১ সালে মধ্য-আয়ের দেশ হিসেবে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করবে। জাতির প্রত্যাশা হচ্ছে, ২০৪১ সালের মধ্যে বিশ্বসভায় বাংলাদেশ একটি উন্নত-সমৃদ্ধ দেশের মর্যাদায় অভিষিক্ত হবে।

আবদুল হামিদ আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘মানবাধিকার, সুশাসন ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপায়ন এবং সমাজের সকল স্তরে প্রত্যক্ষ জন-সম্পৃক্ততার মধ্য দিয়ে আমরা নির্ধারিত লক্ষ্যসমূহ অর্জনসহ একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনে সক্ষম হবো।’

৩০ ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে এবং সার্চ কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী গঠিত বর্তমান নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হয়, যা দেশে-বিদেশে সকল মহলে প্রশংসিত হয়েছে।’

‘বাংলাদেশের জনগণের বিপুল সমর্থনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে চতুর্থবারের মতো মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়। জনগণের এ রায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জননন্দিত নির্বাচনী ইশতেহার ‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’-এর প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থনের বহিঃপ্রকাশ। সরকার নির্বাচনী ইশতেহারে বর্ণিত প্রতিশ্রুতিসমূহ বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর। এই সকল প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে,’ বলেন তিনি।

রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘দেশে আইনের শাসন সুসংহত ও সমুন্নত রাখার ক্ষেত্রে সরকারের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালী করা হয়েছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও তথ্য কমিশন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। কুখ্যাত ‘ইনডেমনিটি’ আইন বাতিল করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা এবং যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার রায় কার্যকর করা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান সরকার অর্থনৈতিক সকল সূচকে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। বিগত ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশের উপরে রয়েছে। চূড়ান্ত হিসাব অনুযায়ী ২০১৭-১৮ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক আট-ছয় শতাংশ। বাংলাদেশ আজ জিডিপি ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে বিশ্ব-অর্থনীতিতে ৩৩তম এবং জিডিপি’র আকারের ভিত্তিতে ৪১তম।’

‘বর্তমানে মাথাপিছু জাতীয় আয় ১ হাজার ৭৫১ মার্কিন ডলার। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ওপরে। অপরদিকে মূল্যস্ফীতির হার ৫ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এসেছে,’ যোগ করেন তিনি।

আবদুল হামিদ উল্লেখ করেন, ‘জাতীয় বাজেটের আকার এবং রাজস্ব আহরণের পরিমাণ অনেকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ক্রমবর্ধমান রাজস্ব আহরণের মাধ্যমে নিজস্ব অর্থে আমরা পদ্মা সেতু এবং ফ্লাইওভার নির্মাণসহ অনেক বৃহৎ প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়ন করছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিগত ১০ বছরে দেশে ও বিদেশে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এ সময়ে দেশের অভ্যন্তরে মোট ১ কোটি ৩৪ লাখের অধিক এবং বিদেশে প্রায় ৮০ লাখ কর্মীর কর্মসংস্থান হয়েছে। বিগত ৫ বছরে ৩৪ লাখ ৮২ হাজার কর্মী বিদেশে গমন করায় প্রায় ৭৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স অর্জিত হয়েছে।’

রাষ্ট্রপ্রধান উল্লেখ করেন, ‘স্বাস্থ্যসেবার নিশ্চিতকল্পে সরকার ১ লাখ ১৫ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫ বছর মেয়াদি স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।’

তিনি বলেন, ‘মাদক, জঙ্গিবাদ ও উগ্র সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হচ্ছে এবং জনজীবনে স্বস্তি ফিরে এসেছে।’

আবদুল হামিদ আরও বলেন, সাইবার অপরাধ দমনের জন্য মনিটরিং সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here