চলতি বছরের মধ্যে দেশের শতভাগ মানুষ বিদ্যুৎ পাবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বুধবার গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এসব বিদ্যুৎ সংযোগ উদ্বোধন করেন তিনি।

উদ্বোধন শেষে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উন্নত বাংলাদেশে প্রতিটি ঘরে বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা হবে। তাই দেশের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে সরকার। কারণ উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে সরকার বদ্ধ পরিকর। আর এর জন্য সুনির্ধারিত পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার।

তিনি আরও বলেন, ২০২০ সালের মধ্যে আরও বেশি উন্নয়ন ও ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এক উন্নত বাংলাদেশকে দৃশ্যমান করতে কাজ চলছে। এরই অংশ হিসেবে প্রতিটি ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার কাজ চলছে। এখন আর বিদ্যুতের জন্য গ্রাহকদের গুরতে হয় না। বরং সংযোগ পৌঁছে যাচ্ছে গ্রাহকদের কাছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমরা উন্নীত হয়েছি। এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি। এবারের নির্বাচনে জনগণ আমাদের ভোট দিয়ে জয়ী করেছেন, তাই আমি জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। জনগণ আমাদের ওপর যে আস্থা রেখেছেন সেটা সামনে রেখেই আমরা এগিয়ে যাব।’

তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নে সব থেকে বেশি প্রয়োজন হল বিদ্যুৎ। যেটা মানুষের চাহিদা। মানুষের খাদ্যের নিরাপত্তা আমরা নিশ্চিত করেছি। আর বিদ্যুতের উৎপাদনের মাধ্যমে প্রতিটা ঘরে আলো জ্বালবো এটাই আমাদের লক্ষ্য। ইতিমধ্যে ৯৩ ভাগ মানুষ বিদ্যুৎ পাচ্ছেন।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘বিদ্যুৎ পেতে এখন আর দৌড়াদৌড়ি করতে হয় না। বরং এখন আমরা আলোর পসরা নিয়ে মানুষের কাছে আমরাই যাচ্ছি। আলো সবার ঘরে আমরাই পৌঁছে দেব।’

তিনি বলেন, ‘মাথাপিছু আয় বেড়েছে, জীবনযাত্রার মান বেড়েছে। সেই সঙ্গে সঙ্গে চাহিদাও বেড়ে যাচ্ছে। আর এই চাহিদার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদনও বাড়াচ্ছি।’

সন্দ্বীপ নিয়ে স্মৃতিচারণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘সন্দ্বীপে আমি বহুবার গিয়েছি। ১৯৮৫ সালের ঘূর্ণিঝড়, ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে ত্রাণ বিতরণ করতে গেছি। মাছের ট্রলারে সন্দ্বীপ থেকে উড়িরচর গেছি ঘূর্ণিঝড়ে আক্রান্ত মানুষদের দেখতে। তখন লবণাক্ত পানিতে সব নষ্ট হয়ে গিয়েছে। পান্তা ভাত, নারিকেল কোরা, আর শুকনো মরিচ দিয়ে ভাত খেয়ে সারাদিন থেকেছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘সন্দ্বীপ দীর্ঘ সময় ধরে উন্নয়ন বঞ্চিত ছিলো। আমরা ক্ষমতা আসার পর থেকে সেখানে একের পর এক প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছি। প্রথমে দশ লক্ষ সোলার প্যানেল দিয়ে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করেছি। এরপর সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে পুরো সন্দ্বীপকে আলোকিত করে দিয়েছি। কাজেই সন্দ্বীপের সকল সমস্যা সমাধানকল্পে যা যা করা দরকার আমরা তা করবো।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সন্দ্বীপের সংসদ সদস্য মাহফুজুর রহমান মিতাকে উদ্দেশ্য করে দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার জন্য তাগিদ দেন।

সাংসদ মাহফুজুর রহমান মিতা বলেন, ‘সন্দ্বীপ-মিরশ্বরাই একটি ব্রিজ করা হলে সন্দ্বীপ মূল ভূখন্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারবে। আমাদের এই দাবি পূরণ হলে সন্দ্বীপের মানুষের দুঃখ লাঘব হবে।’

সন্দ্বীপবাসীকে জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়ার সাংসদ মাহফুজুর রহমান মিতা প্রধানমন্ত্রীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।

ভিডিও কনফারেন্সে সন্দ্বীপ থেকে বক্তব্যে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান মাষ্টার শাহজাহান বিএ বলেন, ‘বর্তমান সরকারের শাসনামলে সন্দ্বীপে যে পরিমাণ উন্নয়ন কর্মকান্ড সাধিত হয়েছে তা অতীতের সমস্ত রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সংযোগ সন্দ্বীপের মানুষের কাছে সোনার হরিণ ছিলো যা আজ স্বপ্ন বাস্তবায়িত হলো।’

ভিডিও কনফারেন্সিং এর মাধ্যমে রাজবাড়ীতে কথা বলার সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাজবাড়ীর মানুষ রাজার হালে থাকবে সেটাই তো আমরা চাই এবং সারা বাংলাদেশের মানুষই রাজার হালে থাকবে। সমগ্র বাংলাদেশের উন্নয়নটাই আমাদের লক্ষ্য। প্রত্যেকটি গ্রাম শহর হবে। আর আমরা ৫৬টি মসজিদ এবং ইসলামিক কালচারাল সেন্টার করে দিচ্ছি। স্কুল কলেজ সবকিছুর উন্নতি করে দিচ্ছি। যেন বাংলাদেশের প্রত্যেকটি গ্রামের মানুষ নাগরিক সুবিধা পায়। কেউ আর শহরে যাওয়ার চেষ্টা করবে না। গ্রামেই নাগরিক সুবিধা পাবে। সেইভাবে আমরা সব করে দেবো।

দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়ে শেখ হাসিনা বলেন, যেন এই উন্নয়নের ধারাটা আমরা অব্যাহত রাখতে পারি এবং আমরা এটা শেষ করতে পারি।

প্রধানমন্ত্রী ১ হাজার ৬২ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার নতুন ৬টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র উদ্বোধন করেন। ক্যাপটিভ ও নবায়ণযোগ্য জ্বালানিসহ বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২০ হাজার ৮৫৪ মেগাওয়াট। নতুন ৬টি বিদ্যুকেন্দ্র স্থাপন করায় জাতীয় গ্রিডে যোগ হলো ১ হাজার ৬২ মেগাওয়াট। নবনির্মিত এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে রয়েছে ভোলা ২২৫ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র, চাঁদপুর ২০০, আশুগঞ্জ ১৫০, রুপসা ১০৫, সিরাজগঞ্জ ২৮২ এবং জুলদা, চট্টগ্রাম ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র।

প্রধানমন্ত্রী নতুন যে ১২ উপজেলায় শতভাগ বিদ্যুতায়নের ঘোষণা দেন সেগুলো হলো- ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু, ঠাকুরগাঁও সদর ও বালিয়াডাঙ্গী, রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ ও কালুখালী, বরগুনার বামনা, হবিগঞ্জের খালাই, শায়েস্তাগঞ্জ, আজমেরীগঞ্জ ও বাহুবল এবং জামালপুরের মেলান্দহ ও ইসলামপুর। এর আগে সরকার ১৮৬টি উপজেলাকে শতভাগ বিদ্যুতায়িত করার ঘোষণা করেন।

এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নে নির্মাণ করা গ্রিড উপকেন্দ্র হলো- লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ ও বরিশাল উত্তর, চট্টগ্রামের বারৈয়ারহাট, নীলফামারীর জলঢাকা ও সুনামগঞ্জ, সিলেটের বিয়ানীবাজার, রাঙামাটি এবং কক্সবাজারের মাতারবাড়ি।

অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা তৌফিক-ই এলাহী ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। এরপর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ ও মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা শুভেচ্ছা জানান। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন প্রধানমন্ত্রীর মূখ্য সচিব নজিবুর রহমান। অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। এছাড়াও, অনুষ্ঠানে সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, সাবেক গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন প্রধানমন্ত্রীর পাশে উপস্থিত ছিলেন। ভিডিও কনফারেন্সিং এর মাধ্যমে সূচনা বক্তব্য শেষে প্রকল্পগুলোর শুভ উদ্বোধন করেন। এরপর ভিডিও কনফারেন্সিং এর মাধ্যমে কয়েকটি জেলায় উপকারভোগীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here