ঘড়ির কাঁটায় রাত ১০টা ১০ মিনিট। কর্মজীবীরা তখন বাসায় ফিরে ক্লান্তি দূর করতে গাঁটা এলিয়ে দেন বিছানায় কিংবা সোফায়। কেউ কেউ আবার পরদিনের কর্মপরিকল্পনা মাথায় নিয়ে ঘুমিয়েও পড়েন। হঠাৎ বিকট শব্দ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দাউদাউ করে জ্বলতে থাকে পুরান ঢাকার চকবাজারের নন্দকুমার দত্ত সড়কের চুরিহাট্টা মসজিদ গলির হাজী ওয়াহেদ ম্যানসন। সেই সঙ্গে একের পর এক বিস্ফোরণ। নিচতলায় রাসায়নিক দ্রব্যের কারখানা থাকায় নিমিষেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের ভবন ও সামনের রাস্তায়। দ্বিগবিদিক ছুটে থাকে মানুষ। অগ্নিকা-ের পর বিচ্ছিন্ন করা হয় ওই এলাকার গ্যাস ও বিদ্যুৎসংযোগ। খবর দেওয়া হয় ফায়ার সর্ভিসকে। কিন্তু চুরিহাট্টার সরু গলিতে কোনোভাবেই পৌঁছতে পারছিলেন না কর্মীরা।

এলাকাবাসীর সহযোগীতায় অনেক চেষ্টার পর শুরু হয় আগুন নেভানোর কর্মযজ্ঞ। রাজধানীর বিভিন্ন স্টেশন থেকে প্রায় ২০০ কর্মী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। যোগ দেন স্বেচ্ছাসেবক ও স্থানীয় যুবকরা। তবে তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমেও বাধ মানছে না আগুনের লেলিহান শিখা। বিদ্যুৎ নেই, চারদিক অন্ধকার; সেই সঙ্গে তীব্র পানির সংকট। তাই রাত বাড়ে, বাড়তে থাকে আগুনের ভয়াবহতা। বাতাসে ছড়াতে থাকে পোড়া মাংসের গন্ধ।

দানবের মতো আগুনের হানায় হাজী ওয়াহেদ ম্যানশনের উত্তরের রাস্তায় থাকা পিকআপ ভ্যান, রিকশা, সাইকেল, মোটর সাইকেল সব নিমিষেই পুড়ে ছাই। যেগুলো বিবর্ণ হয়ে পড়ে আছে চুরিহাট্টার ওই রাস্তায়। গোডাউন, দোকান-পাটের মালামাল লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়ে আছে ভবনের উত্তর ও পশ্চিম পাশের সড়কে; যেন যুদ্ধবিধস্ত কোনো এলাকা বা ধ্বংসস্তূপ। সব জায়গায় বডি স্প্রের কৌটা আর রাসায়নিক উপাদান। ভোরের দিকে আগুন কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলে বের করে আনা হয় একের পর এক পোড়ে অঙ্গার হওয়া দেহ। আলো ফোটার সঙ্গে বাড়তে থাকে লাশের মিছিল।

লাশ মেলে রাস্তায়, দোকানে দোকানে। ওয়াহেদ ম্যানশনের নিচতলার মার্কেটের করিডরের শেষ মাথা থেকে একসঙ্গে ২৪ জনের মরদেহ মিলে। আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে তারা হয়তো দৌড়ে গিয়ে সেখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এ ছাড়া আশেপাশের দোকান ও রেস্টুরেন্ট থেকেও লাশ উদ্ধার করা হয়। আবার ওয়াহেদ ম্যানশনের নিচতলায় টেলিকম, বিপরীতে টেইলার্স, ফার্মেসিসহ আশেপাশের সব দোকান ঘটনার সঙ্গে সঙ্গেই শাটার ফেলে দেন। হয়তো সবাই ভেবেছিল বাঁচতে পারবে। কিন্ত আগুনের তীব্রতায় সেখানেই পুড়ে মারা যান তারা। রাজমহল ও উল্টোদিকের হোটেলে যারা ছিলেন তারাও সেখানে মারা গেছেন। শেষ খবর পর্যন্ত ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে ৬৭টি ব্যাগে করে ৭০ জনের লাশ নেওয়া হয়। এ ছাড়া আরও তিনটি ব্যাগে লাশের খণ্ডিত অংশ আনা হয়। হাজারো স্বজন ভিড় করছেন মর্গের আশপাশে। আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠেছে সেখানকার বাতাস। জীবিত পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়ে স্বজনের লাশের খোঁজে এদিক-ওদিক ছুটোছুটি করছেন কেউ কেউ।

চুরিহাট্টা এলাকাটি মূলত একটি সরু গলি, যেখানে দুটি রিকশা কোনোমতে চলাচল করতে পারে। আবার অগ্নিকান্ডের সময় সরু এ গলি থেকে শুরু করে পাশের ওয়াটার ওয়ার্কস রোড, জেলখানা মোড়সহ আশেপাশের সবখানেই ছিল ভয়বাহ যানজট। তাই যানজটে পড়া মানুষগুলো তখন আর বের হতে পারেন নি। আবার বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গেই হাজী ওয়াহেদ ম্যানশনের দ্বিতীয় তলার পশ্চিম পাশের দেয়ালটি রাস্তার ওপর ভেঙে পড়ে। এতে তাৎক্ষণিকভাবেই মারা যান বেশকজন পথচারী।

হাজী ওয়াহেদ ম্যানশন নামে চারতলা ভবনটির আন্ডারগ্রাউন্ডে আরও একতলা রয়েছে। তার পুরোটাই গুদাম হিসেবে ব্যবহার হতো। আর গুদামবোঝাই কেমিক্যালে, সেখান পর্যন্ত অবশ্য আগুনের লেলিহান শিখা পৌঁছতে পারেনি। দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলার পুরোটাতেই কারখানা ও গুদাম। সেখানে মূলত সুগন্ধি, কসমেটিকস, পাউডার, খেলনা, বাতি, ফ্রিজ মেরামত, গ্রিজ-মবিলসহ দাহ্য পদার্থের ব্যাপক কারবার। নিচতলাতে বিভিন্ন দোকান-পাট ভাড়া দেওয়া আছে। চতুর্থ তলায় থাকেন হাজী ওয়াহেদের দুই ছেলে। কিন্তু ওই ভবনে এখন আর কোনো প্রাণ নেই। কেবল কঙ্কাল হয়ে দাঁড়িয়ে আগুনে পুড়ে যাওয়ার সাক্ষ্য দিচ্ছে হাজী ওয়াহেদ ম্যানশন।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here