বাংলাদেশের নারী-পুরুষের সমতার দিক দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় সবার উপরে রয়েছে । নারী শিক্ষায় এগিয়ে মেয়েরা। বর্তমানে প্রাথমিক স্কুলে মেয়েদের উপস্থিতি শতভাগ। ৯০ সালের পর থেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনায় রয়েছেন নারীরা। আন্তর্জাতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে পৃথিবীতে যেসব দেশে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন সবচেয়ে বেশি হয়েছে, তাদের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। এই সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে পঞ্চম। নারীর উন্নয়ন ও অগ্রগতির এসব প্যারামিটার অনুযায়ী ‘বাংলাদেশের সময় এখন নারীদের।’ বিশেষজ্ঞরা বলছেন নারী উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে বাংলাদেশে বিশ্বের রোল মডেল।

এসব বিষয় মাথায় রেখেই আজ দেশে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। বিশ্বের অন্য দেশের মতো বাংলাদেশে দিবসটি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে যথাযতভাবে পালনের জন্য নানা কর্মসূচী নেয়া হয়েছে। এবারে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিপাদ্য ‘সবাই মিলে ভাবো, নতুন কিছু করো নারী-পুরুষ সমতার নতুন বিশ্ব গড়ো’।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাণী : দিবসটি উপলক্ষে পৃথক প্রথক বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মোঃ আব্দুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে বলেন, বর্তমান সরকার নারী-পুরুষের সমতা বিধানে নারী শিক্ষার বিস্তারে, নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা, নারীর ক্ষমতায়নসহ নারীর প্রতি সব ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধে কর্মসূচী বাস্তবায়ন করছে।

প্রধানমন্ত্রী তার বাণীতে বলেন, সরকার এসডিজির লক্ষ্য অর্জনের জন্য রাষ্ট্র ও জনজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষের সমান অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় বদ্ধপরিকর। দিবসটি উপলক্ষে বিশ্বের সব নারীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার বিগত ১০ বছরে নারীর ক্ষমতায়ন ও নারী উন্নয়নে বিভিন্ন কর্মসূচী বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন দেশ স্বাধীনের পর থেকে দেশে নারী উন্নয়নে নানা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এছাড়া নারীর প্রতি সহিংসতা দমনে দেশে ইতোমধ্যে বিভিন্ন আইন তৈরি করা হয়েছে। নারীর উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে নেয়া হয়েছে নানা পদক্ষেপ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের পুনর্বাসন ও ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে ১৯৭২ সালে ‘নারী পুনর্বাসন বোর্ড’ গঠন এবং জাতীয় জীবনের সব ক্ষেত্রে নারীর সমানাধিকার বিষয়টি সংবিধানে নিশ্চিত করেন।

নারীর প্রতি সব ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধের লক্ষ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি-২০১১, পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন-২০১০, ডিএনএ আইন-২০১৪, বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন-২০১৭ ও যৌতুক নিরোধ আইন-২০১৮। ভিজিডি, বিধবাভাতা, মাতৃত্বকালীন ভাতা, ল্যাকটেটিং মাদার সহায়তা কার্যক্রমসহ বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচীর মাধ্যমে নারীদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কর্মসূচী নেয়া হয়েছে। এসব কর্মসূচী আওতায় মাতৃত্বকালীন ছুটি সবেতনে ৬ মাসে উন্নীত করা ছাড়াও বয়স্ক ভাতা, বিধবা-তালাকপ্রাপ্ত ও নির্যাতিত নারীদের ভাতা, অসচ্ছল প্রতিবন্ধীদের ভাতাও দেশে চালু রয়েছে।

বাংলাদেশে নারীদের এই অগ্রযাত্রার কাহিনী এখন বৈশ্বিক গবেষণার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) বৈশ্বিক লিঙ্গবৈষম্য প্রতিবেদনে নারী-পুরুষের সমতার দিক দিয়ে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে সবার ওপরে স্থান পেয়েছে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী চারটি ক্ষেত্রে আবার বাংলাদেশ বিশ্বের সব দেশের ওপরে স্থান পেয়েছে। এই চারটি ক্ষেত্রের তিনটি হলো- ছেলে ও মেয়েশিশুদের বিদ্যালয়ে ভর্তি, মাধ্যমিকে ছেলে ও মেয়েদের সমতা এবং সরকার প্রধান হিসেবে কত সময় ধরে একজন নারী রয়েছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন দেশে গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীদের ব্যাপক উন্নতি ঘটেছে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে দেশে দুটি দলের বিরোধ থাকলেও নারী উন্নয়নে এবং নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে দুটি সরকারের মধ্যে ব্যাপক ঐক্যমত ছিল। আর এ কারণে দেশে নারীদের অগ্রগতি জয়গান চলছে। তারা বলেন, দেশে নারী শিক্ষার প্রভাব সবক্ষেত্রে পড়েছে। অর্থনীতি, শ্রমবাজার, রাজনীতিসহ সবকিছুর মূলেই রয়েছে নারীর শিক্ষা।

এছাড়াও দেশে রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের দিক থেকে নারীদের অগ্রগতি অনেক। এই সূচকে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে পঞ্চম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন পৃথিবীতে যেসব দেশে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন সবচেয়ে বেশি হয়েছে, তাদের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। গত দশম সংসদে প্রধানমন্ত্রী সংসদ নেতা এবং উপনেতা এবং বিরোধীদলীয় নেতা এবং স্পীকার ছিলেন নারী। একাদশ সংসদেও প্রধানমন্ত্রী, সংসদ নেতা, উপনেতা ও স্পীকার নারী। বিশেষজ্ঞরা বলছেন ’৯০ পর থেকে দেশে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা শুরু হয়। আর এর পুরোধায় ছিলেন নারী। ’৯০ পর থেকে পালাক্রমে নারীরাই দেশ শাসন করে আসছেন। যা বিশ্বে বিরল।

’৭১ সালে যুদ্ধের মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা লাভ করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন পাকিস্তানের কাছ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করলেও স্বাধীনতা এই ৪৭ বছরের পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশ অনেক ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন রয়েছে। এর মধ্যে নারী শিক্ষা এবং নারীর উন্নয়ন অগ্রগতি অত্যতম। দেশের শিক্ষা বিষয়ক পরিসংখ্যান ব্যুরোর ব্যানবেইসের হিসাব অনুযায়ী প্রাথমিক পর্যায়ে মোট শিক্ষার্থীর ৫১ শতাংশ এখন মেয়ে শিশু। বর্তমানে মেয়েদের শতভাগই এখন স্কুলে যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন মেয়েদের জন্য বিদ্যালয়ের যে পরিবেশ দরকার দেশে সেই ধরনের পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষকতায় ৬০ ভাগ শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে নারীদের। প্রাথমিক পর্যায়ে সবার জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা থাকলেও মাধ্যমিক পর্যায়ে শুধু নারীদের বৃত্তির আওতায় আনা হয়েছে। এই বিষয়গুলো দেশের নারী উন্নয়নে কাজে দিয়েছে উল্লেখ করেন তারা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন দেশে নারীর ক্ষমতায়নের যাত্রা শুরু হয় স্বাধীনতার পর থেকে। এ সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে নারী উন্নয়নের ক্ষেত্রে নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ নেয়া হয়। জাতীয় সংসদে সর্বপ্রথম নারীদের জন্য ১৫টি আসন সংরক্ষিত করেন। এটাই বাংলাদেশের ইতিহাসে নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে প্রথম পদক্ষেপ। যার ফলে স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের প্রথম সংসদেই নারীরা প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পায়। বর্তমানে সংসদে সংরক্ষিত নারী প্রতিনিধির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫০ এ। এছাড়া সরাসরি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে সংসদ সদস্য হয়েছেন অনেকেই।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, বর্তমান সরকার নারীর অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে কাজ করে যাচ্ছে। মন্ত্রণালয়গুলোতে জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেট করা হচ্ছে। সব মন্ত্রণালয়ে নারী উন্নয়ন সংক্রান্ত ফোকাল পয়েন্ট নির্ধারণ করা হয়েছে। নারীর ক্ষমতায়ন ও জেন্ডার সমতা নির্ধারণে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ৪টি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে নারীর সামর্থ্য উন্নীতকরণ, নারীর অর্থনৈতিক প্রাপ্তি বৃদ্ধিকরণ, নারীর মতপ্রকাশ ও মতপ্রকাশের মাধ্যম সম্প্রসারণ এবং নারীর উন্নয়নে একটি সক্রিয় পরিবেশ সৃষ্টিকরণ।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here