মিয়ানমারের সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায় রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর ওপর বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটির সামরিক বাহিনীর নিধন অপারেশনে ১০ রোহিঙ্গাকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনা প্রকাশ করায় ‘পুলিৎজার’ পুরস্কার অর্জন করে ‘রয়টার্স’-এর দুই সাংবাদিক। সাংবাদিকতার, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ছাপার সাংবাদিকতা, সাহিত্য এবং সঙ্গীতের সর্বোচ্চ পুরস্কার হিসেবে বহুল সমাদৃত এই ‘পুলিৎজার’। সোমবার (১৫ এপ্রিল) ৪৯০ দিন ধরে জেলে থাকা এই সাংবাদিককে পুরস্কার দেয়ার ঘোষণা আসে।

মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর নির্মম হত্যাকাণ্ডকে প্রকাশ করার দায়ে ওয়া লো এবং কিয়া সো ও’কে আটক করে ৭ বছরের কারাদণ্ড দেয় সুকি সরকার। ২০১৭ সালে মিয়ানমার সরকার রাখাইন রাজ্যে জাতিগত নিধনযজ্ঞ চালায়। হত্যা, ধর্ষণ, লুট, অগ্নিকাণ্ডসহ নির্মন নির্যাতন চালায়। প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় সাড়ে ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা। বাংলাদেশের কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে এগারো লক্ষাধিক রোহিঙ্গা আশ্রিত, যা শতাব্দীর অন্যতম বড় শরণার্থী শিবির।

বিশ্বে ক্রমবর্ধমান সংঘাতের ফলে রোজ সৃষ্ট হচ্ছে শরণার্থী, যা বর্তমান বিশ্বে খুবই সত্য ও উদ্বেগের বিষয়। শুধুমাত্র রোহিঙ্গা না, মধ্য আমেরিকার শরণার্থীদের নিয়ে প্রতিবেদনের কারণে ‘রয়টার্স’ এর এই দুই সাংবাদিকের সঙ্গে এক মার্কিন সাংবাদিক ও পুরস্কার লাভ করেন।

দুই সাংবাদিক এই মর্যাদার পুরস্কার পেলে ‘রয়টার্স’-এর প্রধান সম্পাদক স্টিফেন জে. অ্যাডলার বলেন, ‘এই কাজের জন্য স্বীকৃত হয়ে আনন্দিত হলেও এখন সেসব জনগণের ওপর আমাদের মনোযোগ দেয়া উচিত, যাদের সম্বন্ধে আমরা আমাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করি : এই ক্ষেত্রে রোহিঙ্গা এবং কেন্দ্রীয় আমেরিকান অভিবাসীরা’।

২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ‘রয়টার্স’ এর তরুন দুই সাংবাদিক একটি গণকবর খুঁজে পায় যা মানুষের হাড় দিয়ে ঠাসা। তারা এই হত্যাকাণ্ডের অপরাধী, প্রত্যক্ষদর্শী এবং নির্যাতনের শিকারদের স্বজনদের খোঁজে নেমে পরে তথ্য সংগ্রহের জন্য।

তারা গ্রামবাসীদের কাছ থেকে তিনটি বিধ্বংসী ফটোগ্রাফ পেয়ে যায়। যার দুটোতে দেখা যায় ১০জন রোহিঙ্গা পুরুষকে বাঁধা অবস্থায় হাঁটু গেড়ে মাটির ওপর বসে আছে। তৃতীয়টিতে এই ১০ জন পুরুষের বিস্ফোরিত ও বুলেটে বিধ্বস্ত লাশ এক অগভীর গর্তে চাপা দিয়ে রাখা।

২০১৭ সালের ডিসেম্বরে ওয়া লো এবং কিয়া সো তাদের প্রতিবেদন সমাপ্ত করার আগেই তাদের আটক করে মিয়ানমার পুলিশ যাকে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক দল অত্যন্ত জঘণ্য কাজ বলে সমালোচনা করে এবং প্রতিবেদন প্রকাশে বাঁধা দেয়া হচ্ছে বলে জানায়। ‘ম্যাসাকার ইন মিয়ানমার’ নামক সেই প্রতিবেদনটি তাদের সহকর্মী সাীমন লিউস এবং অ্যান্টনি স্লোডকোসকি ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশ করে।

২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে মিয়ানমারের আদালত আটক দুই সাংবাদিককে দেশের সরকারি অফিসিয়াল সিক্রেট অ্যাক্ট লঙ্ঘন করার জন্য সাত বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছিল। অ্যাডলার বলেন, ওয়া লোন, কিউ সো ও এবং তাদের সহকর্মীরা তাদের অসাধারণ, সাহসী কভারেজ এবং আমাদের ফটোজার্নালস্টিরা তাদের চলমান ছবির জন্য স্বীকৃতি পেয়েছে, যা মানবতার বিরুদ্ধে বিশাল বাধাকে তুলে ধরেছে তাদের এই মর্যাদার পুরস্কার অর্জনে আমি আনন্দিত। এবং একই সঙ্গে আমি গভীরভাবে কষ্টে আছি কারণ আমাদের সাহসী সাংবাদিক ওয়া লো এবং কিউ সো ও এখনও কারাগারে বন্দি রয়েছেন।’

এছাড়াও, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আর্থিক বিবরণী এবং কর ফাঁকি নিয়ে সম্পাদকীয় লেখায় সেই ক্যাটাগরিতে পুলিৎজার লাভ করে ‘নিউইয়র্ক টাইমস’। আরেক মার্কিন প্রভাবশালী গণমাধ্যম ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ মার্কিন প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনের সময় রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পের প্রচারনা চলাকালীন গোপনে তার দুই মিসট্রেস, যারা নিজেদের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক থাকার কথা দাবি করেন তাদেরকে অর্থ প্রদানের তথ্য বের করে আনায় ন্যাশনাল রিপোর্টিং এ পুরস্কারটি লাভ করে।

বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে মানবেতর অবস্থায় থাকা ইয়েমেনের ওপর ফটোজার্নালিজম ক্যাটাগরি ও সমালোচনার জন্যে পুরস্কার পায় ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’। ইয়েমেনের ভয়াবহ চিত্র নিয়ে তথ্যচিত্র ও আন্তর্জাতিক রিপোর্টিং ক্যাটাগরিতে পুলিৎজার লাভ করে মার্কিন সংবাদ সংস্থা ‘এপি’।

২০১৮ সালে ১৪ই ফেব্রুয়ারি ফ্লোরিডার পার্কল্যান্ডের একটি উচ্চ বিদ্যালয়ে বন্দুকধারীর গুলিতে ১৭ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় ‘দা সাউথ ফ্লোরিডা সান সেন্টিনেল পুলিৎজার লাভ করে। বোর্ড বলছে, মারজরি স্টোনম্যান ডগলাস উচ্চ বিদ্যালয়ে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যার আগে ও পরে স্কুল এবং আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাদের ব্যর্থতাকে দোষী করে প্রতিবেদন প্রকাশ করায় জনকল্যান ক্যাটাগরিতে তাদের এই পুরস্কার দেয়া হয়। মারজরি স্টোনম্যান ডগলাস উচ্চ বিদ্যালয়ে ইগল আই স্টুডেন্ট সংবাদপত্রের কর্মীদের হত্যাকান্ড কাভারেজের জন্য পুরস্কার দেয়া হয়

‘পিটসবার্গ পোস্ট-গেজেট’ এর কর্মীরা পিটসবার্গের ট্রি অফ লাইফ সিনাগগ-এর ২০১৮ সালের ২৭ অক্টোবরে ১১ জনের ‘নির্মম ও করুণ’ গণহত্যা কাভারেজের জন্য ব্রেকিং নিউজ ক্যাটাগরিতে পুরস্কার জিতেছে।

পুলিৎজার বোর্ড এছাড়াও মার্কিন ইতিহাসে সাংবাদিকদের ওপর বৃহত্তম হত্যার প্রতি তাদের সাহসী প্রতিক্রিয়ার জন্য অ্যানাপোলিস, মেরিল্যান্ডের ‘ক্যাপিটাল গেজেট’কে একটি বিশেষ উদ্ধৃতি প্রদান করে পুরস্কার দিয়েছে। এক বন্দুকধারী ২৮ জুন ২০১৮-এ গণমাধ্যমটির ভেতরে ঢুকে নির্বিচারে গুলি করে, যাতে তাদের পাঁচ সাংবাদিক নিহত হয়েছিল। মার্কিন ইতিহাসের সবচেয়ে মর্যাদার পুরস্কারটি পেয়েও তাই এই গণমাধ্যমটিতে সহকর্মী হারানোর স্মৃতিতে মলিন রয়েছে।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here