সদাকাতুল ফিতর হলো দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনা শেষে রোজা ভাঙা উপলক্ষে গরিব- মিসকিনকে যা দান করা হয়। হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী দু’টি কারণে সদাকাতুল ফিতর দিতে হয়।

প্রথম কারণ হলো, একজন রোজাদার ব্যক্তির রোজা পালন করতে গিয়ে যেসব ত্রুটি হয়ে যায়, যদিও রোজা তার ভঙ্গ হয়ে যায় না, এ ত্রুটি মার্জনার জন্যই সদাকাতুল ফিতর। যেমন একজন রোজাদার ব্যক্তি পরনিন্দা চর্চা করেছে, অশ্লীল ও অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা বলেছে। এ থেকে রোজাকে পরিশুদ্ধ করার জন্যই সদাকাতুল ফিতর।

দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, দরিদ্র মানুষগুলো এই সমাজেরই মানুষ। তারা সারা বছরই দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করে নিদারুণ কষ্টে থাকে। তারা কমপক্ষে ঈদের দিনের এক দিন যাতে ঈদের আনন্দে সবার সাথে শরিক হতে পারে, এ জন্য তাদের কিছু খাদ্য ও বস্ত্রের ব্যবস্থা করে দেয়া।

তৃতীয় কারণ হচ্ছে, দীর্ঘ এক মাস উপবাস থাকার পর আল্লাহ মেহেরবানি করে ঈদের দিনে পানাহারের অনুমতি দিয়েছেন, তারই শুকরিয়াস্বরূপ সদাকাতুল ফিতর।

আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোজাকে অপ্রয়োজনীয় ও অশ্লীল কথাবার্তা ও কার্যকলাপ থেকে পরিচ্ছন্ন করার জন্য এবং মিসকিনদের কিছু খাদ্যের ব্যবস্থা করার জন্য জাকাতুল ফিতর ফরজ করেছেন (আবুদাউদ, ইবন মাজা, বায়হাকি)। ‘তাদেরকে আজকের দিনে মানুষের বাড়ি বাড়ি ঘোরা থেকে অমুখাপেক্ষী রাখো’ (বায়হাকি, দারু কুতনি)।

সদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব ওই ব্যক্তির ওপর, যার কাছে ঈদুল ফিতরের দিন সকাল বেলা তার প্রয়োজনীয় সামগ্রী ও খাবার ব্যতীত নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে। নেসাব হলো সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ বা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্য বা তার সমপরিমাণ অর্থ বা সম্পদ। যদি স্বর্ণ ও রৌপ্য মূল্যমানে পার্থক্য হয়, তাহলে যেটির মূল্য ধরলে গরিব বেশি উপকৃত হয়, সেটির মূল্যমান ধরেই যাকাত ও ফিতরা আদায় করবে। যদি শুধু স্বর্ণ বা রৌপ্য থাকে, অথবা উভয়টিই থাকে, তাহলে প্রত্যেকটিই আলাদা নেসাব ধরে যাকাত ও ফিতরা দেবে। নিজের এবং তার পোষ্যদের পক্ষ থেকে ফিতরা আদায় করবে।

আব্দুল্লাহ বিন ওমর রা: থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক গোলাম-স্বাধীন, পুরুষ-মহিলা, ছোট-বড় সব মুসলমানের ওপর এক ছা’ খেজুর বা এক ছা’ যব জাকাতুল ফিতর ফরজ করেছেন এবং তা লোকেরা ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বেই আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন (বুখারি, মুসলিম )। আবু সাঈদ খুদরি রা: বর্ণিত; তিনি বলেন, আমরা জাকাতুল ফিতর বের করে দিতাম এক ছা’ খাদ্য আথবা এক ছা’ যব অথবা এক ছা’ খেজুর অথবা এক ছা’ কিশমিশ।

যখন মুআবিয়া রা: মদিনায় এলেন এবং গমের মওসুম এলো; তিনি বললেন, আমি মনে করি এটার এক মুদ উপরিউক্ত মুদের দুই মুদের সমান হবে (বুখারি)। উল্লেখ্য, দুই মুদ এক ছা’ সমপরিমাণ, অতএব এক মুদ অর্ধ ছা’ সমপরিমাণ। ‘আবদুল্লাহ বিন ‘ওমর রা: থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, যখন ওমর রা: খলিফা হলেন এবং গমের উৎপাদন বেড়ে গেল, তখন তিনি অর্ধ ছা’ গমকে উপরিউল্লিখিত বস্তুগুলোর এক ছা’-এর স্থলাভিষিক্ত নির্ধারণ করলেন (আবু দাউদ)। আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রা: থেকে বর্ণিত : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই ছাদাকা (ছাদাকাতুল ফিতর) ফরজ করেছেন এক ছা’ খেজুর, অথবা এক ছা’ যব, অথবা অর্ধ ছা’ গম প্রত্যেক স্বাধীন অথবা দাস, পুরুষ অথবা মহিলা, ছোট অথবা বড়র ওপর (আবু দাউদ)।

হাদিসগুলো থেকে যা বেরিয়ে এলো তা হলোÑ প্রথমত, ছাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব প্রত্যেক নারী-পুরুষ, স্বাধীন-গোলাম, ছোট-বড়, মুসাফির-মুকিম, ধনী-দরিদ্র মুসলিমের ওপর। এতে নিসাব বলতে কোনো শর্ত নেই। ধনীরা ছাদাকাতুল ফিতর আদায় করবে, কিন্তু নিজে গ্রহণ করতে পারবে না, আর দরিদ্র মানুষ নিজের ছাদাকাতুল ফিতর আদায় করবে, আবার অন্যের কাছ থেকে গ্রহণও করতে পারবে। এ মত দিয়েছেন ইমাম শাফেয়ী’, ইমাম মালেক, ইমাম আহমাদ র: ও সৌদি আরবের খ্যাতনামা আলেমগণ। অন্য দিকে ইমাম আবুহানিফা র: এবং তার অনুসারীদের মত হলো, ঈদের দিন সকালবেলা যার কাছে প্রয়োজনীয় সামগ্রী ও সে দিনের খাবার ব্যতীত নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকবে, তার ওপরই সদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব হবে।

যে শিশু ঈদের আগের দিনের সূর্যাস্তের আগে জন্মগ্রহণ করেছে, তার পক্ষ থেকে সদাকাতুল ফিতর আদায় করতে হবে, সূর্যাস্তের পর জন্মগ্রহণ করলে তার পক্ষ থেকে আদায় করতে হবে না। কেউ সূর্যাস্তের পর মারা গেলে সদাকাতুল ফিতর আদায় করতে হবে, সূর্যাস্তের আগে মারা গেলে দিতে হবে না। মায়ের গর্ভের সন্তানের ছাদাকাতুল ফিতর দেয়া মুস্তাহাব, অর্থাৎ ভালো।

প্রত্যেক দেশের প্রধান খাদ্য হিসেবে যা বিবেচিত, তা দিয়েই সদাকাতুল ফিতর আদায় করা উত্তম, আবুসাঈদ খুদরি রা:-এর হাদিসে তারই ইঙ্গিত পাওয়া যায়। বাংলাদেশে যেহেতু চাল প্রধান খাদ্য, এক ছা’ চাল দিয়ে এটা আদায় করা অধিক উত্তম।

নগদ অর্থ দিয়ে সদাকাতুল ফিতর আদায় করা যাবে কি না, এ নিয়েও মতভেদ রয়েছে। ইমাম শাফেয়ী, ইমাম মালেক, ইমাম আহমাদ র: ও সৌদি আরবের খ্যাতনামা আলেমগণের মতে, নগদ অর্থ দেয়া বৈধ হবে না। হাদিসে নগদ অর্থের কথা উল্লেখ নেই। আতা, হাসান বাসরি, ছুফয়ান সাওরি, ওমর বিন আব্দুল আজীজ, ইমাম আবু হানিফা ও তার অনুসারীদের মতে, নগদ অর্থ দিয়ে আদায় করা বৈধ। কেননা সদাকাতুল ফিতর আদায়ের অন্যতম লক্ষ্য হলো দরিদ্র মানুষগুলোকে ঈদের আনন্দের সুযোগ করে দেয়া। তাদের প্রয়োজন খাদ্যের, তেমনি প্রয়োজন কাপড়চোপড় ও অন্যান্য সামগ্রীর।

উল্লিখিত হাদিসে মূল্যমান নির্ধারণের ইঙ্গিত পাওয়া যায়, সাহাবা রা: সিরিয়ার দুই মুদ গম, অর্থাৎ অর্ধ ছা’ গমকে মদিনার এক ছা’ খেজুরের সমান মূল্য নির্ধারণ করে সদাকাতুল ফিতর আদায় করেছেন। অতএব, এ ক্ষেত্রে কোনো সীমাবদ্ধতায় না গিয়ে উন্মুক্ত রাখাই শ্রেষ্ঠ, যাতে বিষয়টি সহজ হয়ে যায়। ইসলাম সহজকে পছন্দ করে যদি তাতে গুনাহ না হয়।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা সহজ করো, কঠিন কোরো না’ (বুখারি, মুসলিম)। আয়শা রা: থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, যখনই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দু’টি বিষয়ের কোনো একটি বিষয় বেছে নেয়ার স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে, তখনই তিনি তূলনামূলক সহজটিকে বেছে নিয়েছেন, যদি তা গুনাহের বিষয় না হয়ে থাকে। যদি তা গুনাহের বিষয় হয়ে থাকে, তাহলে তিনি তা থেকে অনেক দূরে থাকতেন (বুখারি, মুসলিম)।

ছা বলা হয় মূলত একজন মাঝারি সাইজের মানুষের দুই হাত ভর্তি চার অঞ্জলি শুকনা খাদ্য। যেমনÑ খেজুর, গম, চাল ইত্যাদি।

ছা-এর পরিমাণ কত হবে, এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। হানাফি আলিমগণ ছা’-এর হিসাব করেন ইরাকি হিসাবে, যার পরিমাণ বর্তমান হিসাবে প্রায় সাড়ে তিন কেজি। আবার অনেকে হিসাব করেন মদিনার ছা’ হিসেবে, যার পরিমাণ কারো মতে দুই কেজি নয় শত আটচল্লিশ গ্রাম, কারো মতে দুই কেজি ছয় শত গ্রাম, কারো মতে দুই কেজি পঁয়ত্রিশ গ্রাম। সৌদি আরবের সর্বোচ্চ ফাতাওয়া বোর্ডের মতে, এক ছা’ তিন কেজির কাছাকাছি এবং এ পরিমাণ আদায় করলে সব সন্দেহের ঊর্ধ্বে আদায় হয়ে যাবে।

আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রা: থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনÑ ওজন হবে মক্কার আর পাত্রের মাপ হবে মদিনার (সহিহ ইবনে হিব্বান)।

ছাদাকাতুল ফিতর ঈদুল ফিতরের দুই দিন আগে থেকে শুরু করে ঈদের সালাতের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত আদায় করা উত্তম। ঈদের পরে আদায় করলে সদাকাতুল ফিতরের উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে, কেননা তাতে ঈদের আনন্দে শামিল হওয়া সম্ভব হবে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন যে ব্যক্তি সালাতের পূর্বে আদায় করবে, তা হবে গ্রহণযোগ্য জাকাত, আর যে ব্যক্তি সালাতের পরে আদায় করবে তা হবে অন্যান্য দানের মতো সাধারণ দান (ইবন মাজাহ)। এখানে সালাত বলতে ঈদের সালাত এবং জাকাত বলতে ছাদাকাতুল ফিতর বোঝানো হয়েছে। যদি এমন জায়গায় বসবাস করে যেখানে দরিদ্র মানুষ খুঁজে পাওয়া যায় না, যেমন সমুদ্রে অবস্থান করছে বা এমন ধনী এলাকা যে, আশপাশে দরিদ্র মানুষের বসবাস নেই, এমতাবস্থায় যখনই সুযোগ আসবে তখনই ছাদাকাতুল ফিতর আদায় করবে, এতে বিলম্বের জন্য গুনাহ হবে না।

ছাদাকাতুল ফিতর দরিদ্র ছাড়া অন্য কাউকে দিলে আদায় হবে না। হাদিসে ছাদাকাতুল ফিতরের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে দরিদ্রের খাবারের ব্যবস্থা করা।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here