প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়—এই নীতিতে আমরা বিশ্বাসী এবং আমরা এটাই মেনে চলি।

তিনি বলেন, এ কারণে পৃথিবীর সব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের চমৎকার সম্পর্ক রয়েছে। এই সম্পর্ক স্থাপনের একটাই উদ্দেশ্য, দেশের মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়ন।

ত্রিদেশীয় সফর নিয়ে রোববার (৯ জুন) বিকালে গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, জাপানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, আমাদের ভালো হোটেল ছিল না, সোনারগাঁও হোটেল জাপান সরকার তৈরি করে দিয়েছিল। বন্ধুপ্রতীম দেশ। এবার সফরে নতুন সম্রাট ও আগের সম্রাটের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে। বাংলাদেশকে নিয়ে অনেক আগ্রহ তাদের।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, যত আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে যাই, বলি, আমাদের সবার কমন এনিমি আছে, দারিদ্র্য। আসুন, আমরা সাধারণ মানুষের উন্নতিটা করি। সেখানে যত খরচ লাগে, ব্যয় করি। দারিদ্র্যই আমাদের সবার বড় শত্রু। এর বিরুদ্ধে সবাইকে লড়াই করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাপান সফর শেষে সৌদি আরবের উদ্দেশ্যে প্লেনে করে যাওয়ার সময় পাইলট যখন জানালেন, আমরা চট্টগ্রামের ওপর দিয়ে যাচ্ছি, তখন মনে হলো, নিজের দেশে নেমেই যাই, পরের দিন যাই (সৌদি আরবে)।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার উদ্যোগ নিয়েছি। এটাকে আন্তর্জাতিক রুটের সঙ্গে সংযুক্ত করার কাজ চলছে। এখানে জ্বালানি নেবে আন্তর্জাতিক রুটের ফ্লাইটগুলো। শুধু জ্বালানিই নেবে না, সুযোগ পেলে ঘুরবেও। যদি আমরা সেভাবে সি-বিচটাকে দেখাতে পারি। কিছু কিছু এলাকা বিদেশি পর্যটকদের জন্য ডেডিকেটেড (তাদের উপযোগী) করে দেবো। এটা করতে পারলে আমরা পর্যটনে আরো এগিয়ে যাব।

বাংলাদেশের ওপর নিরাপত্তাজনিত হুমকি সবসময়ই থাকে  জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, হুমকির কথা জানিয়ে মানুষকে ভীত করতে চাই না। এবারের ঈদ জামাত ও ঈদ উৎসব সুষ্ঠুভাবে শেষ হওয়ায় আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী।

এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘হুমকি সবসময় আসে, অনেক হুমকি। সব বলে মানুষকে ভীত করতে চাই না। আমাদের গোয়েন্দাদের কাছে সব তথ্য আছে। তারা সে অনুযায়ী তৎপর। ঈদের দেশের বাইরে ছিলাম। তবু সব তথ্যই আমার কাছে পৌঁছেছে। কিন্তু আমরা প্রস্তুত। আমি শুধু এটুকু বলব, গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশ বাহিনী সবাই খুব আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করেছে। যে জন্য সুষ্ঠুভাবে ঈদের জামাত শেষ হয়েছে। প্রতিটি জামাত শেষ হওয়ার পর মেসেজ গেছে। শোলাকিয়ায় এর আগে ঘটনা ঘটেছে। এবার কোথাও কিছু হয়নি। আমাদের বড় শক্তি, আমাদের জনগণ খুব সচেতন। তাদের কাছে আবেদন, তারা যেন সজাগ থাকেন, সতর্ক থাকেন।’

এ ধরনের ঘটনা দেশের উন্নয়ন ব্যাহত করে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের ৮ শতাংশ জিডিপি। এটা ধরে রাখতে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ প্রয়োজন। এর জন্য সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। সাংবাদিকদের কাছেও সেই সহযোগিতা চাই। কারও কাছে কোনো তথ্য থাকলে আমাদের জানান।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের দ্রুত অগ্রযাত্রা যেন ব্যাহত না হয় সেজন্য সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।’

ভিআইপি যতোই হোক না কেন কাউকে ইমিগ্রেশনে চেক ছাড়া প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, যখনি আমি বিমানে উঠি তখনি একটা ঘটনা ঘটে। পাসপোর্ট ফেলে রেখে যেতেই পারে কিন্তু ইমিগ্রেশন কেন চেক করেনি? ইমিগ্রশনে প্রবেশ করতে হলে সেখানে টিকিট কেটে যেতে হবে। এট হয়তো অনেকেরে পছন্দ হবে না। তারপরও করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের আগের সরকার কি করেছে বিমান নিয়ে তা আপনাদের জানা থাকার কথা। আমরা যখন বিমানের সংখ্যা বাড়িয়ে আরো কয়েকটি নতুন রুটে যাওয়ার চিন্তা করছি। ঠিক তখনি বার বার এমন ধরনের ঘটনা ঘটছে।

তিনি বলেন, কারা কারা এসব করছেন তাদের খুঁজে বের করা হবে। দেখা যায়, বিমানে সিট খালি থাকে। অথচ অনেকে সিট পায় না। যারা সিট নিয়ে ব্যবসা করেছে তাদের আঁতে ঘা লাগতে পারে। তাই তারা হয়তো বিমান নিয়ে বার বার ঘটনা ঘটাচ্ছে।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তারেককে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে বৃটিশ সরকারের সাথে আলোচনা চলছে। আজ হোক কাল হোক শাস্তি কার্যকর হবে ।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা করে এত মানুষ মেরেছিল, ১০ ট্রাক অস্ত্র নিয়ে এসেছিল, এতিমের টাকা মেরেছে তাদের জন্য কিছু লোকের এত মায়া কান্না কেন? তিনি বলেন, কিভাবে ফিরিয়ে আনা যায় সে বিষয়ে ব্রিটিশ সরকারের সাথে আলাপ চলছে। আজ হোক কাল হোক একটা সময় তার বিচার হবেই।

যারা জঙ্গি হামলা করছে তারা সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর ক্ষমতা কেড়ে নিচ্ছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারা হামলার পর বলে তারা বেহেস্তে যাবে। কই বেহেস্ত থেকে তো কোনো মেসেজ আসেনি! তাহলে তারা কেন আল্লাহর ক্ষমতা কেড়ে নিচ্ছে।

তিনি বলেন, আগে ধারণা করা হতো কওমি মাদ্রাসার ছেলেরা সন্ত্রাসী হামালার সাথে সম্পৃক্ত। কিন্তু এখন দেখা যায়, ইংরেজী মাধ্যমের ছেলেরা এসব হামলায় যুক্ত। তারা ইংরেজী মাধ্যমে পড়াশুনা করে। তাদের সব ইচ্ছাই বাবা, মা পূরণ করে। তাদের কোনো অভাব নাই। অথচ তারা বেহেস্তে যেতে মানুষ খুন করছে। মানুষ খুন করে কি বেহেশতে যাওয়া যায়?

তিনি আরো বলেন, প্রত্যেক মুসলিম দেশে সন্ত্রাস চলছে। মুসলামানরাই মুসলমানদের মারছে, রক্ত ঝরাচ্ছে। কিন্তু এতে লাভবান হচ্ছে কারা? যারা অস্র তৈরি করে, যারা অস্র রপ্তানি করছে, তারাই লাভবান হচ্ছে।

মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের নিতে চায় না বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘আমরা তো চুক্তি করেছি। সব রকম ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাদের (মিয়ানমার সরকার) সঙ্গে যোগাযোগও আছে। কিন্তু ওইভাবে তাদের সাড়াটা পাই না। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার আগ্রহী না।’

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম উপস্থিত ছিলেন।

গত ২৮ মে জাপান দিয়ে ত্রিদেশীয় এই সফর শুরু করেন শেখ হাসিনা। পরে সেখান থেকে সৌদি আরব ও ফিনল্যান্ড যান তিনি। সফরে তৃতীয় ও শেষ দেশ ফিনল্যান্ড থেকে শনিবার (৮ জুন) সকালে দেশে পৌঁছান তিনি।

ত্রিদেশীয় এই সফরের শুরুতেই জাপানের টোকিওতে ‘দ্য ফিউচার অব এশিয়া’ সম্মেলনে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সফরে দেশটির প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন তিনি। বেশ কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য জাপানের সঙ্গে আড়াইশ কোটি ডলারের উন্নয়ন সহায়তা চুক্তি সই হয় তার সফরে।

জাপান সফর শেষে অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কনফারেন্সের (ওআইসি) চতুর্দশ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে ৩০ মে শেখ হাসিনা সৌদি আরবে যান। সম্মেলনে অংশ নেওয়ার পর পবিত্র ওমরাহ পালন করেন তিনি, জিয়ারত করেন মহানবীর (স.)-এর রওজা।

সৌদি আরব থেকে গত ৩ জুন ফিনল্যান্ড যাত্রা করেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে ৪ জুন দেশটির প্রেসিডেন্ট সাউলি নিনিস্তোর সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। পরদিন ৫ জুন অল ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগ ও ফিনল্যান্ড আওয়ামী লীগ তার সম্মানে সংবর্ধনা অনুষ্ঠান আয়োজন করে। প্রধানমন্ত্রী সেই অনুষ্ঠানেও যোগ দেন।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here