বিশ্বকাপের ২৬তম ম্যাচে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ ছিল ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়া। অজিদের ছুঁড়ে দেওয়া ৩৮২ রানের টার্গেটে ব্যাট করতে নেমে ৪৮ রানে হেরেছে বাংলাদেশ। জিততে হলে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জিততে হতো। তবে, নিজেদের সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহ করেই হেরেছে টাইগাররা। অস্ট্রেলিয়াকে কাঁপিয়ে পরাজয়ের ম্যাচে সেঞ্চুরি করে অপরাজিত ছিলেন মুশফিকুর রহিম। বাংলাদেশ ৫০ ওভারে ৮ উইকেট হারিয়ে তোলে ৩৩৩ রান। আগের সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহ ছিল ৩৩০ রান, সেটি এই বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে।

এই জয়ে অস্ট্রেলিয়া ৬ ম্যাচে ১০ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের শীর্ষে উঠলো। ৫ ম্যাচে ৯ পয়েন্ট নিয়ে দুইয়ে নিউজিল্যান্ড, ৫ ম্যাচে ৮ পয়েন্ট নিয়ে তিনে ইংল্যান্ড, ৪ ম্যাচে ৭ পয়েন্ট নিয়ে চারে ভারত আর ৬ ম্যাচে ৫ পয়েন্ট নিয়ে পাঁচে রইলো বাংলাদেশ।

বিশাল লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ইনিংসের চতুর্থ ওভারেই বাংলাদেশ শিবিরে আসে বড় ধাক্কা। দুর্ভাগ্যজনক রানআউটের শিকার হন সৌম্য সরকার।৮ বলে ২ বাউন্ডারিতে সৌম্য সাজঘরের পথ ধরেন ব্যক্তিগত ১০ রানেই।

দ্বিতীয় উইকেটে ৭৯ রানের জুটি গড়েন সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবাল। দুর্দান্ত ফর্মে থাকা সাকিব ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন বিশ্বকাপে টানা পঞ্চম ফিফটির। কিন্তু দলীয় ১০২ রানের মাথায় তিনি আউট হন ব্যক্তিগত ৪১ রানে।

সাকিবের বিদায়ের পর তামিম তুলে নেন চলতি বিশ্বকাপে নিজের প্রথম ফিফটি। মুশফিকের সঙ্গে তার জুটিতে দলীয় সংগ্রহটাও এগুচ্ছিলো বলের সঙ্গে পাল্লা দিয়েই। কিন্তু সুখ যেনো বেশিক্ষণ সয়নি তামিমের।

মিচেল স্টার্কের করা ২৫তম ওভারের প্রথম বলটি ছিলো অফস্টাম্পের বেশ বাইরে। থার্ডম্যান দিয়ে গলাতে গিয়ে উল্টো স্ট্যাম্পে টেনে নেন তামিম। থেমে যায় তার ৭৪ বলে খেলা ৬২ রানের ইনিংসটি।

আগের ম্যাচের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে উইকেটে আসেন লিটন কুমার দাস। কিন্তু প্রথম বলেই তাকে মরণঘাতী এক বাউন্সার দেন স্টার্ক। যা আঘাত হানে সোজা হেলমেটে। বেশ কিছুক্ষণ বন্ধ থাকে খেলা। প্রাথমিক সেবা নিয়ে খেলা শুরু করেন লিটন।

তখন আর মনেই হয়নি প্রথম বলেই মাথায় আঘাত পেয়েছেন তিনি। দারুণ ৩টি চারের মারে ১৬ বলে করে ফেলেন ২০ রান। কিন্তু আউট হয়ে যান লেগ বিফোরের ফাঁদে পড়ে।

এরপরই জুটি বাঁধেন মুশফিক ও মাহমুদউল্লাহ। পঞ্চম উইকেটে জুটি গড়ে এখনও জয়ের আশা বাঁচিয়ে রেখেছেন ২ ভায়রা ভাই মুশফিকুর রহীম ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ।

দুজনই রান করছেন বলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। জুটিতেও পূরণ হয়েছে শতরান। তবে এখনও পাড়ি দিতে হবে অনেক লম্বা পথ। কারণ জয়ের জন্য লক্ষ্যটা যে আকাশছোঁয়া। যা তাড়ায় টাইগার ভক্তদের জয়ের আশা বাঁচিয়ে রাখে মুশফিক ও মাহমুদউল্লাহর জুটি।

ওভারপ্রতি প্রায় ১৫ রানের চাহিদায়, প্রতি ওভারেই একটি-দুইটি করে বাউন্ডারি হাঁকাচ্ছিলেন দুজনে। অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের যথাযথ জবাব দিয়ে দুজন মিলে গড়ে ফেলেন শতরানের জুটি, যেখানে ফিফটি হয়ে যায় দুই ব্যাটসম্যানেরই।

লক্ষ্যটা বিশাল হওয়ায় আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের পরেও শেষের পাঁচ ওভারে বাকি থাকে ৮২ রান। সে ওভার করতে এসেই মূলত বাংলাদেশকে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেন নাথান কোল্টার নিল।

তার করা ৪৬ ওভারের তৃতীয় বলে ছক্কা হাঁকাতে গিয়ে ডিপ স্কয়ার লেগে ধরা পড়েন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। আউট হওয়ার আগে ৫ চার ও ৩ ছক্কার মারে ৫০ বলে ৬৯ রান করেন তিনি। পরের বলেই সরাসরি বোল্ড হয়ে সাজঘরের পথ ধরেন সাব্বির রহমান।

এরপর আর একার পক্ষে বেশিকিছু করা সম্ভব ছিল না মুশফিকের পক্ষে। তবু তিনি দলীয় সংগ্রহটাকে নিয়ে যান ৩৩৩ রান পর্যন্ত, তুলে নেন বিশ্বকাপে নিজের প্রথম সেঞ্চুরি।

মুশফিকও তা পারবেন কিনা তা জানা যাবে পরের ম্যাচেই। তবে আজকের সেঞ্চুরিটি করতে মুশফিক বল খেলেছেন ৯৫টি। ৯ চার ও ১ ছয়ের মারে সাজিয়েছেন নিজের সেঞ্চুরি।

শেষপর্যন্ত বাংলাদেশের ইনিংস থামে ৮ উইকেট হারিয়ে ৩৩৩ রানে। মুশফিক অপরাজিত থাকেন ৯৭ বলে ১০২ রান করে। অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে ২টি উইকেট নেন নাথান কোল্টার নিল, মিচেল স্টার্ক ও মার্কস স্টয়নিস।

এর আগে টস জিতে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন অজি দলপতি অ্যারন ফিঞ্চ। ওয়ার্নারের সেঞ্চুরি ও খাজা-ফিঞ্চের ঝড়ো অর্ধশতকে নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৫ উইকেট হারিয়ে অস্ট্রেলিয়ার সংগ্রহ ৩৮১ রান। জিততে হলে এই পাহাড়সম রান টপকাতে হবে টাইগারদের। বাংলাদেশের টার্গেট ৩৮২ রান।

শুরু থেকে সাবধানী খেললেও সময়ের সাথে সাথে খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসে ওয়ার্নার-স্মিথ। শতরানের উদ্বোধনী জুটিতে অস্ট্রেলিয়াকে দারুণ সূচনা এনে দিয়েছেন তারা। ৯৯ বলে ছুঁয়েছে জুটির সেঞ্চুরি।

নতুন বলে বোলিং শুরু করেছিলেন মাশরাফি বিন মর্তুজা ও মোস্তাফিজুর রহমান। পরে রুবেল হোসেন, সাকিব আল হাসান, মেহেদী হাসান মিরাজকে আক্রমণে এনেও জুটি ভাঙতে পারেনি বাংলাদেশ। অবশেষে ২১ তম ওভারে সৌম্যকে বোলিংয়ে আনেন অধিনায়ক মাশরাফি। নিজের ওভারের শেষ বলে সৌম্যের শর্ট বলে রুবেলের ক্যাচ হয়ে ফিরেছেন ফিঞ্চ। এতে জুটি ভেঙেছে ১২১ রানের। ৫১ বলে ৫ চার ও ২ ছক্কায় ফিঞ্চের ব্যাট থেকে আসে ৫৩ রান।

ব্যক্তিগত ১০ রানে জীবন পেয়েছিলেন ওয়ার্নার। সেই ওয়ার্নার ১১০ বলে তুলে নিলেন তার ওয়ানডে ক্যারিয়ারের ১৬তম শতক। চলতি বিশ্বকাপে ওয়ার্নারের টানা দ্বিতীয় সেঞ্চুরি এটি। এই সেঞ্চুরিতে ওয়ার্নার স্পর্শ করলেন ইংল্যান্ডের জো রুট, নিউজিল্যান্ডের মার্টিন গাপটিল, নাথান অ্যাস্টল এবং অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডাম গিলক্রিস্টকে। ওয়ার্নারের পর নিজের ১১তম ফিফটি তুলে নিয়েছেন উসমান খাজা। ৫০ বলে এসেছে তার এই ফিফটি।

দুর্দান্ত সেঞ্চুরির পরও ব্যাট হাতে বাংলাদেশের বোলারদের কচুকাটা করছিলেন অজি ওপেনার ডেভিড ওয়ার্নার। তবে ব্যক্তিগত ১৬৬ রানের মাথায় সৌম্য সরকারের বলে রুবেল হোসেনের হাতে ক্যাচ দিয়ে বিদায় নিয়েছেন।

ক্রিজে এসেই হাত খুলে মারতে থাকেন অজি অলরাউন্ডার ম্যাক্সওয়েল। রুবেল হোসেনকে মেরেছিলেন দুটি চার, দুটি ছক্কা। পরের ওভারে সৌম্য সরকারের প্রথম বলেই ছক্কা। এর পরের বলেই ফেরেন রান আউট হয়ে। মাত্র ১০ বলে ২ চার ও ৩ ছক্কায় ৩২ রান করেন ম্যাক্সওয়েল।

ম্যাক্সওয়েলের বিদায়ের পর একই ওভারে ফেরেন উসমান খাজা। উইকেটের পেছনে মুশফিকের গ্লাভসবন্দি হওয়ার আগে ৭২ বলে ১০টি বাউন্ডারিতে করেন ৮৯ রান। পরের ওভারে মোস্তাফিজের বলে এলবির ফাঁদে পড়েন স্টিভ স্মিথ। রিভিউ নিয়ে বাঁচতে পারেননি ১ রান করা সাবেক এই অজি দলপতি।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দারুণ জয় পেলেও নিজেদের পরবর্তী ম্যাচে উইনিং কম্বিনেশন ভাঙতে হলো বাংলাদেশকে। কেননা ইনজুরির কারণে দলের দুই অলরাউন্ডার মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন ও মোসাদ্দেক হোসেন সৈতক ছিটকে গেছেন। তাদের পরিবর্তে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ফিরেছেন পেসার রুবেল হোসেন ও হার্ডহিটার ব্যাটসম্যান সাব্বির রহমান।

এদিকে অজিদের দলে এসেছে তিনটি পরিবর্তন। শন মার্শ, কেন রিচার্ডসন, জেসন বেহরনডর্ফ এর পরিবর্তে দলে সুযোগ পেয়েছেন মার্কাস স্টোইনিস, নাথান কোল্টার-নাইল ও অ্যাডাম জাম্পা।

সংক্ষিপ্ত স্কোর:

অস্ট্রেলিয়া: ৫০ ওভারে  ৩৮১/৫  (ফিঞ্চ ৫৩, ওয়ার্নার ১৬২, খাওয়াজা ৮৯ , ম্যাক্সওয়েল ৩২, স্টয়নিস ১৭*, স্মিথ ১, ক্যারি ১১*; মাশরাফি ০/৫৬, মোস্তাফিজ ১/৬৯, সাকিব ০/৫০, রুবেল ০/৮৩, মিরাজ ০/৫৯, সৌম্য ৩/৫৮ )

বাংলাদেশ: ৫০ ওভারে ৩৩৩/৮ (তামিম ৬২, সৌম্য ১০, সাকিব ৪১, মুশফিক ১০২*, লিটন ২০, মাহমুদউল্লাহ ৬৯, সাব্বির ০, মিরাজ ৬, মাশরাফি ৬)।

বাংলাদেশ একাদশ:

তামিম ইকবাল, সৌম্য সরকার, সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিম, লিটন দাস, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, সাব্বির রহমান, মেহেদি হাসান মিরাজ, রুবেল হোসেন, মাশরাফি বিন মর্তুজা (অধিনায়ক), মোস্তাফিজুর রহমান।

অস্ট্রেলিয়া একাদশ:

অ্যারন ফিঞ্চ (অধিনায়ক), ডেভিড ওয়ার্নার, উসমান খাজা, স্টিভেন স্মিথ, মার্কাস স্টোইনিস, গ্লেন ম্যাক্সওয়েল, অ্যালেক্স ক্যারি, নাথান কোল্টার-নাইল, প্যাট কামিন্স, মিচেল স্টার্ক, অ্যাডাম জাম্পা।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here